সারারাত নীলার চোখে ঘুম এলো না।
মায়ের একটি কথাই বারবার কানে বাজছে—
তোর বাবা বেঁচে আছে।
সাত বছর ধরে যে মানুষটিকে মৃত বলে জেনেছে, সে যদি সত্যিই বেঁচে থাকে, তাহলে এই সাত বছর কোথায় ছিল?
কেন ফিরে আসেনি?
কেন একবারও তার খোঁজ নেয়নি?
ভোরবেলা।
কুয়াশা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
রওশন আরা বেগম নীলা ও আরিয়ানকে নিয়ে শহরের বাইরে একটি ছোট গ্রামের দিকে রওনা হলেন।
করিম চাচা কোথাও নেই।
রাতের ঘটনার পর তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে গেছেন।
গাড়িতে কেউ কোনো কথা বলছে না।
শুধু চাকার শব্দ।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর তারা পৌঁছাল একটি পুরনো বাড়ির সামনে।
চারপাশে বিশাল আমগাছ।
নির্জন পরিবেশ।
বাড়িটা দেখে মনে হয় বহুদিন ধরে এখানে কেউ থাকে না।
মা গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে বললেন,
— এখানেই।
নীলার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল।
ভেতর থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন।
মাথায় কিছু পাকা চুল।
চোখের কোণে বয়সের ছাপ।
তবু মুখটা একদম চেনা।
পুরনো ছবিগুলোতে যেমন দেখেছে।
নীলার হাত কাঁপতে লাগল।
চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
মানুষটা ফিসফিস করে বললেন—
— নীলা...
এক মুহূর্ত পর নীলা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— বাবা!
সাত বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এলো।
সাইফুর রহমানও কাঁদছিলেন।
— মা, আমি দুঃখিত...
— কেন চলে গিয়েছিলে?
— আমি যাইনি।
— তাহলে?
— আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।
অনেকক্ষণ পর সবাই ঘরে বসল।
সাইফুর রহমান ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
— সেদিন আমি জানতে পারি, বাবার আসল উইল হারিয়ে যায়নি।
— তাহলে?
— সেটা চুরি করা হয়েছিল।
— কে করেছিল?
সাইফুর রহমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— আমি নিশ্চিত ছিলাম করিম করেছে।
— করিম চাচা?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু পরে বুঝলাম, গল্পটা এত সহজ নয়।
তিনি টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি পুরনো ফাইল বের করলেন।
ফাইলের ভেতরে একটি দলিল।
বয়সের কারণে কাগজ হলদে হয়ে গেছে।
সাইফুর রহমান কাগজটি নীলার হাতে দিলেন।
— এটা পড়ো।
নীলা পড়তে শুরু করল।
এটাই মালিক হোসেনের আসল উইল।
কিন্তু পড়তে পড়তে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
কারণ উইলে লেখা—
নীলা হতবাক।
— তাহলে এত ঝামেলা কেন?
— কারণ এটুকুই পুরো উইল নয়।
সাইফুর রহমান ফাইলের শেষ পাতা বের করলেন।
সেখানে আরেকটি ঘোষণা।
আর সেই ঘোষণাটাই সাত বছরের রহস্যের মূল।
লেখা ছিল—
আমার মৃত্যুর পর পরিবারের কেউ যদি প্রতারণার মাধ্যমে এই সম্পত্তি দখল করার চেষ্টা করে, তাহলে সম্পূর্ণ সম্পত্তি আমার নাতনি নীলা রহমানের নামে হস্তান্তর করা হবে।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
আরিয়ান অবাক।
রওশন আরা বেগম চোখ মুছলেন।
আর নীলা স্থির হয়ে বসে রইল।
সব সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী সে?
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
একটি নয়।
তিনটি গাড়ি।
সাইফুর রহমানের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।
তিনি জানালার কাছে গিয়ে তাকালেন।
তারপর ফিসফিস করে বললেন—
— তারা এসে গেছে।
— কারা?
— যাদের আমি সাত বছর ধরে এড়িয়ে বেড়াচ্ছি।
বাড়ির সামনে কয়েকজন লোক নেমে এলো।
তাদের মাঝখানে একজন স্যুট পরা ভদ্রলোক।
বয়স ষাটের কাছাকাছি।
তাকে দেখে সাইফুর রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
নীলা অবাক হয়ে বলল,
— উনি কে?
সাইফুর রহমান ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন—
লোকটি বাড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
তারপর বলল—
সাত বছর লুকিয়ে ছিলে সাইফুর। এবার খেলা শেষ।
বিষয় : উপন্যাস

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
সারারাত নীলার চোখে ঘুম এলো না।
মায়ের একটি কথাই বারবার কানে বাজছে—
তোর বাবা বেঁচে আছে।
সাত বছর ধরে যে মানুষটিকে মৃত বলে জেনেছে, সে যদি সত্যিই বেঁচে থাকে, তাহলে এই সাত বছর কোথায় ছিল?
কেন ফিরে আসেনি?
কেন একবারও তার খোঁজ নেয়নি?
ভোরবেলা।
কুয়াশা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
রওশন আরা বেগম নীলা ও আরিয়ানকে নিয়ে শহরের বাইরে একটি ছোট গ্রামের দিকে রওনা হলেন।
করিম চাচা কোথাও নেই।
রাতের ঘটনার পর তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে গেছেন।
গাড়িতে কেউ কোনো কথা বলছে না।
শুধু চাকার শব্দ।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর তারা পৌঁছাল একটি পুরনো বাড়ির সামনে।
চারপাশে বিশাল আমগাছ।
নির্জন পরিবেশ।
বাড়িটা দেখে মনে হয় বহুদিন ধরে এখানে কেউ থাকে না।
মা গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে বললেন,
— এখানেই।
নীলার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।
ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল।
ভেতর থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন।
মাথায় কিছু পাকা চুল।
চোখের কোণে বয়সের ছাপ।
তবু মুখটা একদম চেনা।
পুরনো ছবিগুলোতে যেমন দেখেছে।
নীলার হাত কাঁপতে লাগল।
চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
মানুষটা ফিসফিস করে বললেন—
— নীলা...
এক মুহূর্ত পর নীলা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— বাবা!
সাত বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এলো।
সাইফুর রহমানও কাঁদছিলেন।
— মা, আমি দুঃখিত...
— কেন চলে গিয়েছিলে?
— আমি যাইনি।
— তাহলে?
— আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।
অনেকক্ষণ পর সবাই ঘরে বসল।
সাইফুর রহমান ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
— সেদিন আমি জানতে পারি, বাবার আসল উইল হারিয়ে যায়নি।
— তাহলে?
— সেটা চুরি করা হয়েছিল।
— কে করেছিল?
সাইফুর রহমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— আমি নিশ্চিত ছিলাম করিম করেছে।
— করিম চাচা?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু পরে বুঝলাম, গল্পটা এত সহজ নয়।
তিনি টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি পুরনো ফাইল বের করলেন।
ফাইলের ভেতরে একটি দলিল।
বয়সের কারণে কাগজ হলদে হয়ে গেছে।
সাইফুর রহমান কাগজটি নীলার হাতে দিলেন।
— এটা পড়ো।
নীলা পড়তে শুরু করল।
এটাই মালিক হোসেনের আসল উইল।
কিন্তু পড়তে পড়তে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
কারণ উইলে লেখা—
নীলা হতবাক।
— তাহলে এত ঝামেলা কেন?
— কারণ এটুকুই পুরো উইল নয়।
সাইফুর রহমান ফাইলের শেষ পাতা বের করলেন।
সেখানে আরেকটি ঘোষণা।
আর সেই ঘোষণাটাই সাত বছরের রহস্যের মূল।
লেখা ছিল—
আমার মৃত্যুর পর পরিবারের কেউ যদি প্রতারণার মাধ্যমে এই সম্পত্তি দখল করার চেষ্টা করে, তাহলে সম্পূর্ণ সম্পত্তি আমার নাতনি নীলা রহমানের নামে হস্তান্তর করা হবে।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
আরিয়ান অবাক।
রওশন আরা বেগম চোখ মুছলেন।
আর নীলা স্থির হয়ে বসে রইল।
সব সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী সে?
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
একটি নয়।
তিনটি গাড়ি।
সাইফুর রহমানের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।
তিনি জানালার কাছে গিয়ে তাকালেন।
তারপর ফিসফিস করে বললেন—
— তারা এসে গেছে।
— কারা?
— যাদের আমি সাত বছর ধরে এড়িয়ে বেড়াচ্ছি।
বাড়ির সামনে কয়েকজন লোক নেমে এলো।
তাদের মাঝখানে একজন স্যুট পরা ভদ্রলোক।
বয়স ষাটের কাছাকাছি।
তাকে দেখে সাইফুর রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
নীলা অবাক হয়ে বলল,
— উনি কে?
সাইফুর রহমান ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন—
লোকটি বাড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
তারপর বলল—
সাত বছর লুকিয়ে ছিলে সাইফুর। এবার খেলা শেষ।

আপনার মতামত লিখুন