মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

উপন্যাস

নীল খামের রহস্য

নীল খামের রহস্য
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

পর্ব ৯ : শেষ অপেক্ষা

বাড়ির ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।

সাইফুর রহমান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

তার চোখে ভয় নেই।

বরং দীর্ঘ সাত বছরের ক্লান্তি।

নীলা প্রথমবার বুঝতে পারল—

মানুষটা শুধু নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লুকিয়ে ছিলেন না।

তিনি কাউকে রক্ষা করার জন্যও লড়াই করছিলেন।


বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

টক...

টক...

টক...

তারপর বাইরে থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—

— সাইফুর সাহেব, এবার বেরিয়ে আসুন।

সাইফুর রহমান ধীরে ধীরে বললেন,

— লোকটার নাম কামাল হোসেন।

— দাদার ব্যবসার অংশীদার?

— হ্যাঁ।

— আর এই সবকিছুর পেছনে উনিই?

— হ্যাঁ।


আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

— কিন্তু করিম চাচা?

সাইফুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— করিম ভুল করেছে, কিন্তু সে আসল অপরাধী নয়।

— তাহলে?

— কামাল তাকে ব্যবহার করেছে।


সাত বছর আগের গল্পটা ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করল।

মালিক হোসেন মারা যাওয়ার আগে একটি বড় অঙ্কের অর্থ ও জমির হিসাব গোপন নথিতে লিখে গিয়েছিলেন।

সেই নথি প্রকাশ হলে কামাল হোসেনের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি সামনে চলে আসত।

তাই তিনি উইল এবং নথি দুটোই নিজের হাতে নিতে চেয়েছিলেন।


সাইফুর রহমান বললেন,

— যেদিন আমি সত্যিটা জানতে পারি, সেদিনই আমার ওপর হামলা হয়।

— আর মা?

নীলা মায়ের দিকে তাকাল।

রওশন আরা বেগমের চোখ ভিজে উঠেছে।

— আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।

— তাই সবাইকে বললে বাবা মারা গেছে?

— হ্যাঁ।

— এত বড় মিথ্যা?

— যদি না বলতাম, তাহলে তোর বাবা বাঁচত না।


নীলার চোখে জল চলে এলো।

সাত বছর ধরে মাকে সে ভুল বুঝেছে।

যে নারী এতদিন সত্য লুকিয়েছিলেন, তিনি আসলে নিজের পরিবারকে রক্ষা করছিলেন।


ঠিক তখনই দরজা ভেঙে কয়েকজন লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সবার সামনে কামাল হোসেন।

তিনি হেসে বললেন,

— অনেক নাটক হয়েছে।

— এখন ফাইলটা দিন।


সাইফুর রহমান শান্তভাবে বললেন,

— না।

— তাহলে?

— আজ সব সত্য প্রকাশ হবে।


কামাল হোসেন রাগে ফেটে পড়লেন।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির বাইরে পুলিশের সাইরেন বেজে উঠল।

ওয়াঁ... ওয়াঁ...

ওয়াঁ...

সবাই চমকে উঠল।


আরিয়ান মৃদু হাসল।

— আমি আসার আগে সব নথির কপি থানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।


কামাল হোসেনের মুখের রঙ বদলে গেল।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ তাকে এবং তার সহযোগীদের আটক করল।


সবকিছু শেষ হওয়ার পর উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল নীলা।

অনেকদিন পর আকাশটা পরিষ্কার।

মনে হচ্ছে যেন তার জীবন থেকেও মেঘ সরে গেছে।


আরিয়ান ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

— এখন কী ভাবছ?

নীলা মৃদু হাসল।

— ভাবছি, এতদিন যেটাকে শেষ ভেবেছিলাম, সেটাই আসলে শুরু ছিল।


আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— একটা কথা বলব?

— বলো।

— তোমাকে ছাড়া আমার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারি না।


নীলা হেসে ফেলল।

চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।

— এতদিনে বললে?

— সাহস পাইনি।

— আর এখন?

— এখন হারানোর ভয় নেই।


নীলা আকাশের দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল—

— আমারও নেই।


দূরে দাঁড়িয়ে সাইফুর রহমান আর রওশন আরা বেগম তাদের দেখছিলেন।

দু'জনের চোখেই প্রশান্তি।

সাত বছরের অন্ধকার অবশেষে শেষ হয়েছে।


চলবে...


বিষয় : উপন্যাস

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নীল খামের রহস্য

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

featured Image

পর্ব ৯ : শেষ অপেক্ষা

বাড়ির ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।

সাইফুর রহমান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

তার চোখে ভয় নেই।

বরং দীর্ঘ সাত বছরের ক্লান্তি।

নীলা প্রথমবার বুঝতে পারল—

মানুষটা শুধু নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লুকিয়ে ছিলেন না।

তিনি কাউকে রক্ষা করার জন্যও লড়াই করছিলেন।


বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

টক...

টক...

টক...

তারপর বাইরে থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—

— সাইফুর সাহেব, এবার বেরিয়ে আসুন।

সাইফুর রহমান ধীরে ধীরে বললেন,

— লোকটার নাম কামাল হোসেন।

— দাদার ব্যবসার অংশীদার?

— হ্যাঁ।

— আর এই সবকিছুর পেছনে উনিই?

— হ্যাঁ।


আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

— কিন্তু করিম চাচা?

সাইফুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— করিম ভুল করেছে, কিন্তু সে আসল অপরাধী নয়।

— তাহলে?

— কামাল তাকে ব্যবহার করেছে।


সাত বছর আগের গল্পটা ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করল।

মালিক হোসেন মারা যাওয়ার আগে একটি বড় অঙ্কের অর্থ ও জমির হিসাব গোপন নথিতে লিখে গিয়েছিলেন।

সেই নথি প্রকাশ হলে কামাল হোসেনের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি সামনে চলে আসত।

তাই তিনি উইল এবং নথি দুটোই নিজের হাতে নিতে চেয়েছিলেন।


সাইফুর রহমান বললেন,

— যেদিন আমি সত্যিটা জানতে পারি, সেদিনই আমার ওপর হামলা হয়।

— আর মা?

নীলা মায়ের দিকে তাকাল।

রওশন আরা বেগমের চোখ ভিজে উঠেছে।

— আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।

— তাই সবাইকে বললে বাবা মারা গেছে?

— হ্যাঁ।

— এত বড় মিথ্যা?

— যদি না বলতাম, তাহলে তোর বাবা বাঁচত না।


নীলার চোখে জল চলে এলো।

সাত বছর ধরে মাকে সে ভুল বুঝেছে।

যে নারী এতদিন সত্য লুকিয়েছিলেন, তিনি আসলে নিজের পরিবারকে রক্ষা করছিলেন।


ঠিক তখনই দরজা ভেঙে কয়েকজন লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সবার সামনে কামাল হোসেন।

তিনি হেসে বললেন,

— অনেক নাটক হয়েছে।

— এখন ফাইলটা দিন।


সাইফুর রহমান শান্তভাবে বললেন,

— না।

— তাহলে?

— আজ সব সত্য প্রকাশ হবে।


কামাল হোসেন রাগে ফেটে পড়লেন।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির বাইরে পুলিশের সাইরেন বেজে উঠল।

ওয়াঁ... ওয়াঁ...

ওয়াঁ...

সবাই চমকে উঠল।


আরিয়ান মৃদু হাসল।

— আমি আসার আগে সব নথির কপি থানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।


কামাল হোসেনের মুখের রঙ বদলে গেল।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ তাকে এবং তার সহযোগীদের আটক করল।


সবকিছু শেষ হওয়ার পর উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল নীলা।

অনেকদিন পর আকাশটা পরিষ্কার।

মনে হচ্ছে যেন তার জীবন থেকেও মেঘ সরে গেছে।


আরিয়ান ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

— এখন কী ভাবছ?

নীলা মৃদু হাসল।

— ভাবছি, এতদিন যেটাকে শেষ ভেবেছিলাম, সেটাই আসলে শুরু ছিল।


আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— একটা কথা বলব?

— বলো।

— তোমাকে ছাড়া আমার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারি না।


নীলা হেসে ফেলল।

চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।

— এতদিনে বললে?

— সাহস পাইনি।

— আর এখন?

— এখন হারানোর ভয় নেই।


নীলা আকাশের দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল—

— আমারও নেই।


দূরে দাঁড়িয়ে সাইফুর রহমান আর রওশন আরা বেগম তাদের দেখছিলেন।

দু'জনের চোখেই প্রশান্তি।

সাত বছরের অন্ধকার অবশেষে শেষ হয়েছে।


চলবে...



দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো