৪০০ শিক্ষার্থীর স্কুলে এবার পরীক্ষার্থী ৩ জন, টানা দুই বছর পাস করেনি কেউ
একসময় যেখানে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর কলকাকলিতে মুখরিত থাকত পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, এখন সেখানে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র তিনজনে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, চলতি বছরের পরীক্ষায় তাঁদের কেউই পাস করতে পারেননি। শুধু এবারই নয়, গত বছরও ছিল একই চিত্র। ফলে টানা দুই বছর ধরে বিদ্যালয়টি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই পাসের মুখ দেখতে পাননি।চট্টগ্রামের নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এমন করুণ পরিণতি ও বিপর্যয়কর ফলাফল নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও সুশীল সমাজের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির পাসের হার শূন্য শতাংশ।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়দের মতে, তীব্র শিক্ষকসংকট, শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক দুরবস্থা এবং প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৬ বছরেও এমপিওভুক্ত হতে না পারাই প্রতিষ্ঠানটির এই চরম ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মূল কারণ।শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এই বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকে দুজন এবং বিজ্ঞান বিভাগ থেকে একজনসহ মোট তিনজন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তিনজনের কেউই পাস করতে পারেনি। এর আগে ২০২৫ সালেও মানবিক বিভাগ থেকে অংশ নেওয়া দুজন শিক্ষার্থীর দুজনই অকৃতকার্য হয়।মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরো ক্যাম্পাসে এক ভৌতিক নীরবতা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। জানা যায়, ফল প্রকাশের পরদিন পুরো বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন ছাত্রী উপস্থিত হয়েছিল।বিদ্যালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী আটজন শিক্ষকের পদ থাকলেও সেদিন প্রধান শিক্ষকসহ মাত্র দুজন উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে রটেছে, ফলাফল বিপর্যয়ের খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা চাপ সৃষ্টি করতে পারেন—এমন আশঙ্কায় অন্য শিক্ষকেরা বিদ্যালয়ে আসেননি।২০০১ সালে নারীশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে স্থানীয় শওকত সিকদারসহ কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্বের উদ্যোগে ৮৪ শতক জমির ওপর নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে পাঠদানের অনুমতি এবং ২০০৮ সালে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়।কিন্তু দীর্ঘ ২৬ বছর পার হয়ে গেলেও বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো স্থায়ী বেতন-ভাতা না থাকায় অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার গুণগত মান ও নিয়মিত পাঠদানে।পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ২৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ১৭ জন পাস করেছিল। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে শুরু হয় চরম বিপর্যয়, যা টানা দুই বছর ধরে পাসের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।বিদ্যালয়টির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিবি মরিয়ম শান্তা তার দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলে, আমাদের স্কুলে শিক্ষকের অভাবে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। কোনো টিউবওয়েল না থাকায় পাশের বাড়ি থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানি আনতে হয়। বাংলায় শিক্ষক থাকলেও ইংরেজি ও গণিতের কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। শিক্ষক না থাকলে আমরা কীভাবে পাস করব?শান্তা আরও যোগ করে, আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, তখন অনেক শিক্ষার্থী ছিল। এখন বলতে গেলে স্কুলে কেউই নেই। শিক্ষকেরা নিয়মিত না থাকলে আমাদের পড়াশোনায় মন বসে না।বিদ্যালয়ের বয়োবৃদ্ধ প্রধান শিক্ষক সুখেন্দ্র বিকাশ দে তাঁর সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, “আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষকদের ধরে রাখা যাচ্ছে না এবং ন্যায্য পাওনা দিতে না পারায় তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাও সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক পাওয়া যেত। নারীশিক্ষার কথা চিন্তা করে বৃদ্ধ বয়সেও কষ্ট করে প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।”উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আর্থিক সংকটে শিক্ষক-কর্মচারী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।[TECHTARANGA-POST:1102]বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, কী কী সুনির্দিষ্ট সমস্যার কারণে এমন ফল বিপর্যয় হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ফলাফল উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।