মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

চলনবিলের জলপথে শিক্ষার আলো: ইউনেসকো কনফুসিয়াস পুরস্কারে ভূষিত বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা

বর্ষায় যখন চারদিক পানিতে থৈ থৈ করে, পথঘাট ডুবে গিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন, তখন চলনবিল অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একটাই চিন্তা থাকে— কীভাবে স্কুলে যাবে? দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বছরের একটা বড় সময় যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ত, তাদের দুয়ারেই এখন রোজ সকালে এসে হাজির হয় আস্ত একটি স্কুল! কোনো স্থায়ী ভবন নয়, বরং চলনবিলের বুকে ভেসে বেড়ানো নৌকাগুলোই এখন কোমলমতি শিশুদের শ্রেণিকক্ষ।চলনবিল অঞ্চলের এই সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে ভাসমান বিদ্যালয়ের মাধ্যমে অনন্য উপায়ে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের নাম। মর্যাদাপূর্ণ ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার-২০২৫ অর্জন করেছে দেশীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা।আজ বুধবার (১০ জুন) বিকেলে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত জমকালো অনুষ্ঠানে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের জন্য এই উদ্ভাবনী উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে এর উদ্ভাবক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ানের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয়।সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার ভাসমান বিদ্যালয় প্রকল্পটি একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এবং স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি অঞ্চল চলনবিলের জলপথকে ব্যবহার করেই মূলত এই শিক্ষাসহায়তা দেওয়া হচ্ছে।সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, প্রতিটি নৌকা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ দেশীয় ও স্থানীয় নৌকা নির্মাণ জ্ঞান। আবার আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রতিটি নৌকায় সংযোজন করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ (Solar Power) ব্যবস্থা। বর্তমানে সিধুলাইয়ের বহরে রয়েছে মোট ৫৬টি বিশেষায়িত নৌকা। যার বিন্যাস যেকোনো আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও টেক্কা দেবে :২৬টি ভাসমান শ্রেণিকক্ষ (যেখানে প্রতিদিন শিশুরা পড়াশোনা করে)।১০টি ভাসমান গ্রন্থাগার ও অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব।৮টি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।বাকি নৌকাগুলো নিয়োজিত রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত (পরিবহন) কার্যক্রমে।পুরস্কারপ্রাপ্তির পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন—স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সরাসরি অংশগ্রহণকে ভিত্তি করেই যেকোনো টেকসই সমাধান গড়ে ওঠে। আমাদের বিশ্বাস, যে সমস্যার মুখোমুখি একটি সম্প্রদায় প্রতিদিন হয়, সেই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের ধারণাও প্রায়শই সেই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই উঠে আসে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল এবং ভবিষ্যতে আমাদের আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা দেবে।ইউনেসকো ঢাকা আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষা পৌঁছে দিতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের কার্যক্রম শুধু শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিই বাড়ায় না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সহায়তা করে। সরকার এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগকে দেশব্যাপী উৎসাহিত ও সম্প্রসারণে কাজ করছে।[TECHTARANGA-POST:847]চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় ১৯৬৭ সাল থেকে সাক্ষরতা ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকো এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার দিয়ে আসছে। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতিবছর বিশ্বের মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এই অনন্য সম্মাননা দেওয়া হয়। চলতি বছর বাংলাদেশের সিধুলাই-এর পাশাপাশি এই পুরস্কার পেয়েছে আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা) এবং মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয়।উল্লেখ্য, বৈশ্বিক এই মঞ্চে বাংলাদেশের এমন গৌরবোজ্জ্বল অর্জন এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৩ সালে বেসরকারি সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ এবং ২০১৩ সালে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন মর্যাদাপূর্ণ ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার অর্জন করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছিল। সিধুলাইয়ের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আবারও প্রমাণ করল— সদিচ্ছা আর স্থানীয় উদ্ভাবনী শক্তি থাকলে যেকোনো ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকেই জয় করা সম্ভব।

চলনবিলের জলপথে শিক্ষার আলো: ইউনেসকো কনফুসিয়াস পুরস্কারে ভূষিত বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা