মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

১২০ বছরের দীর্ঘ জীবন: কাবার ভেতরে জন্ম নেওয়া সেই সাহাবির অবিশ্বাস্য জীবনগাথা।

পৃথিবীর ইতিহাসে কোটি কোটি মানুষের আগমন ঘটেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে একমাত্র হাকিম ইবনে হিজাম (রা.)-ই সেই অনন্য সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি পবিত্র কাবাঘরের ভেতরে ভূমিষ্ঠ হওয়ার বিরল মর্যাদা লাভ করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে তো বটেই, মানব ইতিহাসের পাতাতেও এই ঘটনা এক পরম বিস্ময়।রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের ঠিক ১৩ বছর আগে অর্থাৎ হস্তী বাহিনীর ঐতিহাসিক ঘটনারও ১৩ বছর পূর্বের কথা। হাকিম (রা.)-এর মা ফাখিতা বিনতে জুহাইর একদিন কুরাইশ নারীদের একটি দলের সঙ্গে পবিত্র কাবাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। হঠাৎ করেই সেখানে তাঁর তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তাঁকে তাৎক্ষণিক বাইরে বের করা সম্ভব ছিল না। নিরুপায় হয়ে কাবার ভেতরেই একটি চামড়া বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানেই জন্ম নেন হাকিম ইবনে হিজাম। সম্পর্কে তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.)-এর আপন ভাতিজা।হাকিম (রা.) মক্কার এক সম্পদশালী ও অভিজাত পরিবারে বড় হন। তিনি এতটাই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান ও ভদ্র ছিলেন যে, তৎকালীন আরবের কঠিন প্রথা ভেঙে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তাঁকে কুরাইশদের দারুন নাদওয়া বা নীতি-নির্ধারণী পরামর্শ সভার সদস্য করা হয়েছিল—যেখানে সদস্য হওয়ার সাধারণ নিয়মই ছিল ন্যূনতম ৪০ বছর বয়স।ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও পরোপকারী। মক্কায় আগত হাজিদের আপ্যায়ন ও অভাবীদের অকাতরে সাহায্য করার কারণে আরবে তাঁকে মুতয়িম বা অন্নদাতা বলা হতো। নবীজি (সা.) ও বনু হাশিম যখন শিবে আবি তালিবে নির্মমভাবে অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন হাকিম (রা.) অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও গোপনে তাঁর ফুফু খাদিজা (রা.)-এর জন্য উটের পিঠে করে খাদ্যসামগ্রী পাঠাতেন।নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও হাকিম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন অনেক দেরিতে—অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। কেন সত্য ধর্ম গ্রহণ করতে এত দেরি হলো, তা নিয়ে তিনি সারা জীবন আফসোস ও অনুতাপ করতেন। মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি (সা.) তাঁর পুরোনো বন্ধুকে বিশেষ সম্মান দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি হাকিম ইবনে হিজামের ঘরে আশ্রয় নেবে, সে সম্পূর্ণ নিরাপদ।একবার নবীজি (সা.) তাঁকে একটি কোরবানি বা ছাগল কেনার জন্য এক দিনার দিয়েছিলেন। তিনি সেই এক দিনারে একটি ছাগল কিনে তা বাজারে অন্য একজনের কাছে দুই দিনারে বিক্রি করে দেন। এরপর লভ্যাংশের টাকা থেকে পুনরায় এক দিনার দিয়ে আরেকটি ছাগল কেনেন এবং নবীজির দরবারে এসে একটি ছাগল ও বেঁচে যাওয়া এক দিনার লভ্যাংশ বুঝিয়ে দেন। নবীজি (সা.) তাঁর এই অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে ভীষণ খুশি হন এবং তাঁর উপার্জনে বরকতের জন্য বিশেষ দোয়া করেন।মক্কার কুরাইশ নেতাদের ঐতিহাসিক পরামর্শ কেন্দ্র দারুন নাদওয়ার পৈতৃক মালিক ছিলেন হাকিম (রা.)। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি প্রাচীন এই ভবনটি হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে এক লাখ দিরহামে বিক্রি করে দেন। কুরাইশরা যখন আভিজাত্য ও বংশীয় মর্যাদার প্রতীক বিক্রির অপরাধে তাঁকে তিরস্কার করেন, তখন তিনি এক ঐতিহাসিক ও দাঁতভাঙা জবাব দেন। তিনি বলেন—জাহেলিয়াত যুগের সব মর্যাদা ও আভিজাত্য আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে (ইসলামের আগমনে)। এখন শুধু তাকওয়া বা খোদাভীতি ছাড়া আর কোনো মর্যাদা অবশিষ্ট নেই। আমি এই ঘরটি বিক্রি করে যে অর্থ পেয়েছি, তার পুরোটাই আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে জান্নাতে একটি ঘর কিনতে চাই।ইসলাম গ্রহণের পর হাকিম (রা.) তাঁর বাকি জীবন ইবাদত, অনুশোচনা ও দানে উৎসর্গ করেন। তিনি একাধিকবার হজ করেছেন। কোনো এক হজে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ১০০টি উট ও এক হাজার ছাগল কোরবানি করেন এবং নিজ খরচে ১০০ জন দাসকে মুক্ত করে দেন। তিনি সব সময় আল্লাহর দরবারে কাঁদতেন আর বলতেন, যে আল্লাহ আমাকে বদরের যুদ্ধে কাফের অবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে ইসলামের আলো দেখিয়েছেন, তাঁর শুকরিয়া আদায় করে শেষ হওয়ার নয়।[TECHTARANGA-POST:661]হজরত হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) ১২০ বছর বয়সে ৫৪ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনের দীর্ঘ ১২০ বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক (৬০ বছর) কেটেছে জাহেলিয়াতের যুগে এবং বাকি অর্ধেক জীবন কেটেছে ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পথে। কাবার ভেতরে জন্মের সেই অলৌকিক স্মৃতি আর ইসলামের প্রতি তাঁর উৎসর্গ আজও মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

১২০ বছরের দীর্ঘ জীবন: কাবার ভেতরে জন্ম নেওয়া সেই সাহাবির অবিশ্বাস্য জীবনগাথা।