মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

খাগড়াছড়ির তীব্র পানিসংকট ও পাহাড়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

দেশের এক প্রান্তে যখন হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় অকাল বন্যায় জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকেরা কষ্টের ধান ঘরে তুলতে পারছেন না, তখন অন্য প্রান্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে চলছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকার। বৈপরীত্যে ভরা এই চিত্র আমাদের পরিবেশগত ও জলবায়ুগত সংকটের এক নির্মম বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলেই খাগড়াছড়ির নয়টি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। দৈনন্দিন ব্যবহারের তো বটেই, এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য পাহাড়ের মানুষকে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। ঝিরি, ঝরনা আর কুয়া থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই সংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি এখন জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পাহাড়ের জীবনযাত্রার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।একসময় পাহাড়ের মানুষ প্রাকৃতিক উৎস থেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে পানির প্রয়োজনীয়তা মেটাত। কিন্তু মানুষের অবিবেচকের মতো কর্মকাণ্ড আর প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বাধা সৃষ্টির কারণে আজ প্রকৃতি বৈরী আচরণ শুরু করেছে। খাগড়াছড়ির এই তীব্র পানিসংকটের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক মিশ্র বন উজাড় করে একজাতীয় সেগুন বা রাবারবাগান করার কারণে মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছরই নিচে নেমে যাচ্ছে। একসময় পাহাড়ের যে ঝিরি ও ছড়াগুলো ছিল বারোমাসি পানির উৎস, আজ পাথর খেকোদের অতি লোভ আর উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে সেগুলো মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে।পানির এই তীব্র সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। বিশেষ করে দীঘিনালা, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ির দুর্গম এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির অভাব সবচেয়ে প্রকট। নিরাপদ পানির অভাবে পাহাড়ি জনপদের মানুষ অনিরাপদ উৎসের দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে ডায়রিয়া, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো মারাত্মক পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এমনকি শহরাঞ্চলেও এখন ৫০০ ফুটের নিচে ছাড়া টিউবওয়েলে পানি মিলছে না, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করে।[TECHTARANGA-POST:654]খাগড়াছড়ির এই পানিসংকট নিরসনে এখন আর ঢিমেতালে চলার সুযোগ নেই; প্রয়োজন সমন্বিত, সুদূরপ্রসারী ও টেকসই পরিকল্পনা। জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে পাহাড়ের ঢালু স্থানগুলোতে বড় আকারের কৃত্রিম জলাধার তৈরি করে বর্ষার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে একজাতীয় বাগান করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার করতে হবে। বন রক্ষা পেলে পাহাড়ের আর্দ্রতা যেমন বজায় থাকবে, তেমনি ঝরনাগুলোও ফিরে পাবে তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রাণ। এছাড়া, পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরি থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধ পাথর উত্তোলন কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষা করেই আমাদের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। সরকারি উদ্যোগে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সর্বোপরি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। খাগড়াছড়ির প্রতিটি ঘরে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা কেবল একটি মৌলিক অধিকার বা উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি এখন পাহাড়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এখনই যদি যথাযথ ও কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই জল-সংকট এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

খাগড়াছড়ির তীব্র পানিসংকট ও পাহাড়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।