মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

প্রতিশ্রুতির পরেও রক্ষা হলো না ‘ভোরের পাখি’, তিস্তায় বিলীন বিদ্যালয়

স্কুলঘর তো নদীত চলি গেল, আমরা এখন কই ক্লাস করব। আজ কতদিন থাকি স্কুলঘর রক্ষা করার জন্য স্যার বিভিন্ন জায়গাত দৌড়াদৌড়ি করছে। এর আগত মন্ত্রী, ডিসি, ইউএনও আসি ঘুরি গেল, তাও তো স্কুলের ঘর রক্ষা হলো না। কত দিনে এই স্কুলঘর উঠবে, তারপর আবার ক্লাস শুরু হইবে। আমরা এখন কী করব।মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার গ্রামে তিস্তা নদীর তীব্র স্রোতে ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি’ সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার পর ডুকরে কেঁদে উঠে কথাগুলো বলছিল স্কুলে আসা পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী। চোখের সামনে নিজেদের প্রিয় বিদ্যাপীঠটি নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে কোমলমতি শিশুরা।স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ৮ আগস্ট সরকারের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ নিজে কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার গ্রামের তিস্তার এই ভাঙনকবলিত এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করেন। সে সময় লালচামার বাজারের পথসভায় তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন—আর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার কিংবা রাস্তাঘাট নদীতে বিলীন হতে দেওয়া হবে না এবং দ্রুত স্থায়ী সমাধান করা হবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখার আগেই তিস্তার পেটে চলে গেল পুরো স্কুলটি।ইউপি সদস্য আরও অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও আন্তরিকতার অভাবেই ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটি নদীতে তলিয়ে গেল। এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎ ও পড়ালেখার স্বাভাবিক পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রশাসনের জরুরি সুদৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ দাবি করেন।ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম সাদা বলেন, মঙ্গলবার ভোরে হঠাৎ তীব্র ভাঙনের খবর পেয়ে তিনি অন্যান্য সহকারী শিক্ষকদের নিয়ে তড়িঘড়ি স্কুলে ছুটে যান। দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও কিছু আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তারা টিনশেড ঘরের টিন খোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে নদীর তীব্র স্রোতে একটি ঘর মুহূর্তেই ধসে পড়ে পানিতে ভেসে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুলের ওয়াশ ব্লকসহ অন্য ঘরটিও তিস্তার পেটে তলিয়ে যায়।সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নূর মোহাম্মদ জানান, ঘটনার খবর পেয়ে সহকারী শিক্ষা অফিসার মুকুল চন্দ্র বর্মণসহ তিনি নিজে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং শিক্ষক ও স্থানীয়দের সহায়তায় কিছু সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ওই এলাকার শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অতিদ্রুত শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি বলেন, সকালে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং শিক্ষা অফিসার বিষয়টি তাঁকে অবহিত করেছেন। তিনি শিক্ষা অফিসার এবং পাউবো কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ে বিকল্প স্থানে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।[TECHTARANGA-POST:1124]তবে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম এই বিষয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সুন্দরগঞ্জের ভোরের পাখি স্কুলটি বিলীন হওয়ার বিষয়ে তাঁরা অবগত। কিন্তু এতে পাউবোর তাৎক্ষণিক বেশি কিছু করার ছিল না। নদীভাঙন দেখা দিলে সাময়িকভাবে জিও টিউব বা জিও ব্যাগ ফেলা এবং ওপরমহলে রিপোর্ট পাঠানো ছাড়া তাঁদের কোনো বড় বাজেট বা এখতিয়ার থাকে না। তিনি স্পষ্ট জানান, মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন এবং গতিপথ পরিবর্তন করা ছাড়া তিস্তার এই ভয়াবহ ভাঙন রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

প্রতিশ্রুতির পরেও রক্ষা হলো না ‘ভোরের পাখি’, তিস্তায় বিলীন বিদ্যালয়