অপতথ্য প্রতিরোধ, স্বাধীন গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকত্ব
গণমাধ্যমের অবাধ্য ও মুক্ত চর্চাকে যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ও স্বার্থকতা নির্ভর করে একটি সচেতন নাগরিক সমাজের ওপর। আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে মানুষ প্রতিদিন তথ্যের এক অসীম সমুদ্রে সাঁতার কাটছে। তবে বিড়ম্বনা হচ্ছে, তথ্যের পর্যাপ্ততার চেয়ে এখন বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা—তা নির্ধারণ করতে পারা। একটি চটকদার কিংবা অসম্পূর্ণ শিরোনাম, কাটছাঁট করা ছবি কিংবা এডিট করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে মুহূর্তে জনমতকে বিভ্রান্ত করে তুলছে। এহেন পরিস্থিতিতে তথ্য গ্রহণের পাশাপাশি তার সঠিক উৎস, উদ্দেশ্য ও বস্তুনিষ্ঠতা বিচার করার সক্ষমতা অর্জন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় নাগরিক তাগিদ।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে সংবাদের গতি বাড়লেও বেড়েছে অপতথ্য এবং অসত্য তথ্য ছড়ানোর বহুগুণ ঝুঁকি। গণমাধ্যম-সচেতনতা বলতে কেবল সংবাদ পাঠ করা বোঝায় না; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ, পেছনের স্বার্থ চিহ্নিতকরণ ও নিরপেক্ষতা অনুধাবন। তবে সব দায় কেবল সাধারণ তথ্যগ্রহীতা বা পাঠকদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। এখানে সংবাদমাধ্যমেরও পেশাগত নৈতিকতা এবং গণস্বার্থ রক্ষার বড় দায়িত্ব রয়েছে। দ্রুততম সময়ে সংবাদ দেওয়ার অনর্থক প্রতিযোগিতা বা ক্লিকবেইট সংস্কৃতির কাছে বস্তুনিরপেক্ষতা যেন হেরে না যায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। গণমাধ্যমের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে জনগণের আস্থার ওপর; আর সেই আস্থা অর্জিত হয় তথ্যের নির্ভুলতা ও পেশাগত সততার মাধ্যমে।বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অসত্য বা অসত্যে ঘেরা তথ্যের প্রভাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অসংবেদনশীল ঘটনা কিংবা সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সামাজিকভাবে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার নজির নতুন নয়। এসব অপতথ্য প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সংবাদমাধ্যমের সত্যনিষ্ঠতা, সঠিক তথ্য যাচাইয়ের সামাজিক সংস্কৃতি ও নাগরিকদের পরিপক্কতা। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো—সরকারি তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ বজায় রাখা। অপতথ্য দমনের অজুহাতে স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর আঘাত কিংবা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার যেকোনো প্রয়াস যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি স্বাধীনতার নাম দিয়ে দায়িত্বহীনভাবে অসত্য ছড়ানোও কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।ইউনেস্কোর বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহের মূল বার্তাকে কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সপ্তাহের মধ্যে বন্দি না রেখে, একে নাগরিক সংস্কৃতির নিয়মিত চর্চায় পরিণত করতে হবে। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকাই হলো একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে স্বাধীন গণমাধ্যম, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সাধন অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তরিক হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে তাদের নীতি ও জবাবদিহিতায় অবিচল থাকতে হবে, আর নাগরিককে হতে হবে তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল।