শূন্য থেকে শুরু করে শত প্রতিকূলতা জয় করে পাহাড়ের বুকে সফলতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন খাগড়াছড়ির নারী উদ্যোক্তা নেইম্রা মারমা। ২০১৭ সালে মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে পাহাড়ি গ্রামে একটি ছোট্ট খাবারের দোকান দিয়ে তাঁর যে লড়াই শুরু হয়েছিল, আজ তা শতাধিক গ্রাহকের বসার সুব্যবস্থাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ ও জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে রূপ নিয়েছে। সমাজের নানা উপহাস ও ব্যক্তিগত বড় ধরনের ট্র্যাজেডি পেছনে ফেলে নেইম্রা মারমার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আজ বহু তরুণ ও নারীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।জীবনের শুরুতে মা ও ভাইকে হারিয়ে চরম আর্থিক সংকট ও দারিদ্র্যের মুখে পড়েন নেইম্রা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষগুলোকে হারানোর পর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা কিংবা বড় কোনো পুঁজি ছাড়াই কেবল অদম্য আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে তিনি ‘স্বপ্নচূড়া’ নামের একটি ফুচকা ও নুডলসের দোকান চালু করেন। শুরুর দিনগুলোতে তাঁকে নিজের হাতে খাবারের ঝুড়ি নিয়ে দ্বারে দ্বারে বা বাইরে ছোটাছুটি করতে হতো। সে সময় আশপাশের অনেকের কাছ থেকে অবহেলা ও উপহাসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। একপর্যায়ে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও তিনি বিন্দুমাত্র হাল ছাড়েননি; বরং নতুন উদ্যমে সবকিছু শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এলাকাবাসীর মন জয় করে তাঁর গ্রাহকসংখ্যা বাড়াতে শুরু করেন।ব্যবসা কিছুটা বড় হওয়ার পর নেইম্রা উপলব্ধি করেন যে, কেবল শারীরিক পরিশ্রম নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা, হিসাবরক্ষণ ও আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া বড় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ঠিক সেই সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং আইডিএফ-এর যৌথ ‘রেইজ’ (RAISE) প্রকল্প। ২০২৪ সালে তিনি এই প্রকল্প থেকে ৫ লাখ টাকার সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং ১৬ দিনের একটি সমন্বিত ও পেশাদার প্রশিক্ষণ লাভ করেন। এই প্রশিক্ষণে তাঁকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উন্নত গ্রাহকসেবা, অনলাইন মার্কেটিং এবং আধুনিক হিসাবরক্ষণপদ্ধতি শেখানো হয়।প্রশিক্ষণ থেকে প্রাপ্ত বাস্তব জ্ঞান তাঁর ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে এনে দেয় নতুন মাত্রা। ঋণের অর্থ এবং নিজের জমানো সঞ্চয় মিলিয়ে তিনি ‘স্বপ্নচূড়া’ রেস্টুরেন্টের পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেন। পূর্বে যেখানে একবারে মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন বসতে পারতেন, আজ সেখানে একসঙ্গে ১০০-এরও বেশি অতিথি আরামদায়ক পরিবেশে খাবার উপভোগ করতে পারেন। আধুনিক এই রেস্টুরেন্টে দুপুরের সুস্বাদু খাবার, বিকেলের স্ন্যাকস, শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় কিডস জোন এবং একটি নান্দনিক ফিশ অ্যাকুয়ারিয়াম যুক্ত করা হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করছে।রেস্টুরেন্টের নিয়মিত গ্রাহক সজীব মারমা সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, এখানের খাবারের মান অত্যন্ত ভালো, দাম সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ চমৎকার হওয়ায় পরিবার নিয়ে প্রায়শই তাঁরা এখানে আসেন। শুধু নিজের স্বাবলম্বিতাই নয়, নেইম্রার এই উদ্যোগে বর্তমানে ১৫ জন নারী কর্মী কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন; যার মধ্যে ১২ জন পূর্ণকালীন এবং ৩ জন খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল থেকে আসা কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার খরচ চালাতে তিনি নিয়মিত সহায়তা করে যাচ্ছেন।[TECHTARANGA-POST:1509]একসময়ের উপহাসের সেই ছোট্ট দোকানটি আজ এতটাই পরিচিতি পেয়েছে যে স্থানীয়রা ওই এলাকাকে ‘স্বপ্নচূড়া আবাসিক এলাকা’ হিসেবেই চিনতে শুরু করেছেন। সফল এই নারী উদ্যোক্তা এখন আর থামতে চান না; অদূর ভবিষ্যতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মতো বড় বড় শহরে ‘স্বপ্নচূড়া’র শাখা খোলার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। নতুন প্রজন্মের তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে নেইম্রা মারমার সরল বার্তা—‘স্বপ্ন দেখুন, নিজের সাহসের ওপর ভরসা রাখুন এবং জীবনের কোনো পরিস্থিতিতেই কখনো হাল ছাড়বেন না।’
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।