বেকারত্ব: বৈশ্বিক সংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
আমাদের অর্থনীতি আজ এক অদ্ভুত ও জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে। চারপাশের প্রযুক্তিগত বিপ্লব, অটোমেশন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার দেখে যখন আমরা নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন বুনি, ঠিক তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাখো তরুণ-তরুণীর কর্মহীন মলিন মুখ। একদিকে বুকভরা আশা নিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের জন্য সম্মানজনক কাজের সুযোগ তৈরি করতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এই বিপরীতমুখী বাস্তবতাই আজ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকট।বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক বেকারত্বের হার বর্তমানে প্রায় ৪.৮ থেকে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ জন কোনো কাজ পাচ্ছেন না। উন্নত বিশ্বে এই হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আমাদের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমীকরণ কিন্তু ভিন্ন। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে শিক্ষিত বেকারের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি খটকা লাগে যখন আমরা আমাদের দেশের অফিশিয়াল পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই।পরিসংখ্যান বনাম আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতা :সরকারি খাতায় বলা হচ্ছে—আমাদের দেশে বেকারত্বের হার ৪.৪ থেকে ৪.৭ শতাংশের মধ্যে, আর বেকারের সংখ্যা ২৬ থেকে ২৭ লাখ। কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক বা সমাজ পর্যবেক্ষক হিসেবে যখন আমি চারপাশের বাস্তবতার সাথে এই সংখ্যাগুলো মেলাই, তখন বড় ধরনের একটি ফারাক বা বৈপরীত্য চোখে পড়ে।আমার মনে হয়, এই কাগজ-কলমের হিসাবের আড়ালে আসল সত্যটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। কারণ :শিক্ষিত যুব বেকারত্ব ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ : সাধারণ বেকারের সংখ্যার চেয়ে আমাদের তরুণ ও শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার কয়েক গুণ বেশি। এটিই সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা।ছদ্ম বা গোপন বেকারত্ব : অনেকেই হয়তো লোকদেখানো কোনো একটা কাজ করছেন, কিন্তু তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী সেই কাজের মান বা আয় কোনোটিই পর্যাপ্ত নয়। এই যে অনিশ্চিত ও নামমাত্র কাজ করে জীবন পার করা, এটিও কিন্তু এক ধরনের গোপন বেকারত্ব।দক্ষতা ও বাজারের চরম অমিল : আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিনিয়ত যে জিপিএ-৫ আর সার্টিফিকেটধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, আধুনিক চাকরির বাজারের চাহিদার সাথে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। প্রায়োগিক ও কারিগরি দক্ষতার এই অভাব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি ব্যর্থতা।বেকারত্ব কি কেবলই অর্থনৈতিক সমস্যা, নাকি সামাজিক অস্থিরতা?সমাজে যখনই কোনো অপরাধ বা অস্থিরতা বাড়ে, আমরা খুব সহজে রায় দিয়ে দিই—কাজ নেই, তাই পোলাপান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অপরাধবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটিকে স্ট্রেইন বা চাপের প্রতিক্রিয়া বলা হলেও, আমি মনে করি এটিই পুরো সত্য নয়। অপরাধপ্রবণতার পেছনে শুধু বেকারত্ব নয়; বরং আমাদের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, আইনের অসম প্রয়োগ, মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক বৈষম্য সমানভাবে দায়ী।তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দিনের পর দিন বেকার বসে থাকা একজন মানুষের আত্মসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। এই চরম হতাশা ও মানসিক চাপ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছাড়িয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর এক অদৃশ্য কালো ছায়া ফেলে।[TECHTARANGA-POST:584]আমরা প্রায়ই বলি আমাদের দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল কর্মক্ষম শক্তিকে যদি আমরা কাজে লাগাতে না পারি, তবে এই আশীর্বাদ খুব দ্রুতই আমাদের জন্য অভিশাপ বা টাইমবোমা হয়ে দাঁড়াবে। এই সংকট কাটাতে আমার দৃষ্টিতে কিছু সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি :শিক্ষাকে চাকরি-মুখী করা : চিরাচরিত মুখস্থ বিদ্যার সার্টিফিকেট দিয়ে আর কাজ হবে না। আমাদের কারিগরি ও ভোকেশনাল ট্রেইনিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। আইটি, ডাটা সায়েন্স, আধুনিক মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স এবং গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো বাস্তবমুখী কাজ শেখাতে হবে।উদ্যোক্তা বান্ধব পরিবেশ গড়া : তরুণদের শুধু 'চাকরি খোঁজা'র মানসিকতা থেকে বের করে আনতে হবে। সরকার ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে স্টার্টআপ বা নতুন আইডিয়ায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। ব্যবসা নিবন্ধনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না কমলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না।বেসরকারি খাতের বহুমুখীকরণ : শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর পুরো অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়ে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের আইটি খাত, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ট্যুরিজম ও আধুনিক কৃষিতে ব্যাপক বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা প্রয়োজন।দক্ষ প্রবাসীবাজার : অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্স বাড়ানোর চেয়ে আইটি ও টেকনিক্যাল সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে পারলে দেশের ওপর কর্মসংস্থানের চাপ অনেকটাই কমবে।একটি আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের কর্মের নিশ্চয়তা দেওয়া। কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; কাজের পরিবেশ হতে হবে নিরাপদ এবং মজুরি হতে হবে জীবনযাত্রার মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা যদি এখনই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ না করি, তবে সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।