মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

বেলুচিস্তানের রুক্ষ পাহাড়ে সশস্ত্র নারী কমান্ডার শাইনাজ, বদলে যাচ্ছে বিএলএ’র রণকৌশল

বেলুচিস্তানের রুক্ষ ও ধূসর পাহাড়শ্রেণির পটভূমিতে সম্প্রতি একটি সামরিক পোশাক পরিহিতা নারীর ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। চারপাশে সারিবদ্ধ সশস্ত্র নারী যোদ্ধা, দৃষ্টিতে দৃঢ়তা আর কণ্ঠে অবিচল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিএলএ-এর কমান্ডার হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছ ওই নারীর। বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে কমান্ডার সাদো নামে, যার আসল নাম শাইনাজ বালোচ।ধারণা করা হচ্ছে, দশকের পর দশক ধরে চলা বেলুচ সশস্ত্র আন্দোলনে তিনিই প্রথম নারী, যিনি এতটা প্রকাশ্য ও উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের আসনে উপবিষ্ট হয়েছেন।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শাইনাজ বালোচের এই আবির্ভাব হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এটি ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বেলুচিস্তানে নাগরিক প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম দুটি ভিন্ন স্রোত ক্রমশ একে অপরের কাছাকাছি এসে মিলছে। এক দিকে মেহরাং বালোচ ও সাম্মি দীন বালোচের নেতৃত্বে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি)-র মাধ্যমে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজপথে অহিংস আন্দোলন চলছে; অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে উঠছে বিএলএ-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এই দুই স্রোতের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে শাইনাজ বালোচ রাজনৈতিক কর্মী থেকে সরাসরি অস্ত্রধারী কমান্ডারের ভূমিকায় উত্তরিত হয়েছেন।সম্প্রতি দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শাইনাজ বালোচ তাঁর দর্শন, লড়াইয়ের কৌশল ও নারী ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:নিজের এই রূপান্তরকে কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ শাইনাজ। তাঁর মতে, এটি হেগেলের বিচ্ছিন্নতা-উত্তরণ দর্শনের প্রতিফলন। ঔপনিবেশিক কাঠামোর অধীনে টিকে থাকাই এক ধরনের আত্ম-বিচ্ছিন্নতা। তাই অস্ত্র হাতে তোলা তাঁর কাছে আবেগ নয়, বরং নিজের সত্তাকে ফিরে পাওয়ার আত্মপ্রকাশ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সমাজের অর্ধেক অংশ নারীদের কেবল ইতিহাসের দর্শক বানিয়ে রাখলে জাতীয় মুক্তি অসম্ভব।বিএলএ-এর মজিদ ব্রিগেড-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের ব্যাখ্যায় শাইনাজ তিনটি কারণ তুলে ধরেন। প্রথমত, রাষ্ট্র সব শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সশস্ত্র প্রতিরোধই এখন অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায়। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সংগ্রামের প্রভাবে সমাজের সেকেলে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে, যা নারীকে ঘরের ভেতর মুক্ত করেছে। এবং তৃতীয়ত, তরুণ নারীদের ক্রমবর্ধমান শিক্ষার হার ও রাজনৈতিক সচেতনতা।নারীদের অস্ত্র হাতে নেওয়াকে শুধুই ব্যক্তিগত শোক বা ট্রমার ফল হিসেবে দেখা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেন শাইনাজ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন পুরুষ যোদ্ধা অভিযানে যোগ দিলে তাঁকে আদর্শবাদী বলা হয়, কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে আবেগ বা মানসিক দুর্বলতা খোঁজা হয় কেন? একজন পুরুষকে শুধুই কমান্ডার বলা হলেও আমাকে কেন নারী কমান্ডার বলা হয়? তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আদর্শিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই তাঁদের সংগঠনে যোদ্ধা নির্বাচন করা হয়।বিওয়াইসি-র মতো অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে সশস্ত্র লড়াইয়ের কোনো সংঘাত নেই উল্লেখ করে শাইনাজ বলেন, দুটোই একই আন্দোলনের দুটি রূপ। তবে রাজপথের আন্দোলন রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা প্রকাশ করলেও, ফরাসি দার্শনিক ফ্রাঁৎস ফানোঁর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন, সংগঠিত শক্তি ছাড়া কোনো ঔপনিবেশিক কাঠামোর পতন ঘটানো যায় না।[TECHTARANGA-POST:1036]শাইনাজের ভাষায়, তাঁদের এই লড়াই কেবল সীমান্ত পরিবর্তন বা ক্ষমতার রদবদলের জন্য নয়। বিজয়ের মূল অর্থ হলো ন্যায়বিচার, লিঙ্গসাম্য ও সম্পদের যৌথ মালিকানার ওপর দাঁড়ানো এক নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা—যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয় নির্ধারিত হবে তাঁদের নিজস্ব সম্ভাবনা দিয়ে, কোনো সংঘাত বা দারিদ্র্য দিয়ে নয়।

বেলুচিস্তানের রুক্ষ পাহাড়ে সশস্ত্র নারী কমান্ডার শাইনাজ, বদলে যাচ্ছে বিএলএ’র রণকৌশল