মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ
স্কুলপড়ুয়াদের ঝুঁকি বেশি, নারী শিক্ষার্থীদের হার ৬২ শতাংশ; প্রতিযোগিতার চাপ ও সামাজিক বাস্তবতা বড় কারণদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এসব তথ্য ১৬৫টি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার বিশ্লেষণ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।সমীক্ষা অনুযায়ী, আত্মহত্যার পেছনে হতাশা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিষয়, মানসিক অস্থিরতা এবং যৌন নির্যাতনের মতো নানা কারণ কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিকভাবে সংবেদনশীল এই বয়সে শিশু, কিশোর ও তরুণরা নানা চাপের মধ্যে থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং ও সহিংস আচরণ, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।পরিসংখ্যান বলছে, করোনা মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫৩২ এবং ২০২৩ সালে ৫১৩। পরের বছর ২০২৪ সালে তা কমে ৩১০-এ নেমে এলেও ২০২৫ সালে আবার বৃদ্ধি পেয়েছে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই স্কুল পর্যায়ের। এতে স্পষ্ট হয়, অল্প বয়সেই শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিযোগিতা ও পড়াশোনার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভর হওয়ায় এই চাপ আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভর্তি পরীক্ষা চালু এবং বিভিন্ন শ্রেণিতে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের ৬২ শতাংশই নারী। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পরিবার ও সমাজে মেয়েদের প্রতি সংবেদনশীলতার ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি, যার পেছনে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ক্যারিয়ারজনিত চাপ বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।শুধু শিক্ষার্থী নয়, সামগ্রিকভাবেই দেশে আত্মহত্যার হার বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অভিভাবকদের সচেতন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এ ছাড়া শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাইবার বুলিংসহ ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।