মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

মিয়ানমারে শিক্ষা বিপর্যয়: নতুন শিক্ষাবর্ষে স্কুলের বাইরে ৬৩ লাখ শিশু

চলমান গৃহযুদ্ধ, চরম অর্থনৈতিক সংকট, গণ-বাস্তুচ্যুতি এবং প্রশাসনিক জটিলতায় এক নজিরবিহীন শিক্ষা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে মিয়ানমার। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশটির স্কুলগামী বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। সংখ্যা হিসেবে যা ৬৩ লাখেরও বেশি। থাইল্যান্ডভিত্তিক মিয়ানমারের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।মিয়ানমারের থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি–মিয়ানমার (আইএসপি–মিয়ানমার)-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ১ জুন শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৬৭ লাখ। অথচ ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষেও এই সংখ্যা ছিল ৯৭ লাখ। দেশটিতে বর্তমানে স্কুলগামী বয়সী শিশুর সংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লাখ।সামরিক জান্তার দমনপীড়ন ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। ফলে বহু পরিবার সন্তানদের স্কুল ছাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। ইয়াঙ্গুনের দুই সন্তানের এক দিনমজুর মা ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্য ইরাবতীকে বলেন, স্কুলে কোনো ফি না থাকলেও বই ও ইউনিফর্মের খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। মেয়েটা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত, সে আরও পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু আমার এই সামান্য আয়ে আর সম্ভব নয়।২০২১ সালের পর রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকা দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূলধারায় ফেরাতে সম্প্রতি প্লেসমেন্ট পরীক্ষা চালু করেছে জান্তা সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এই সুযোগ প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় উচ্চমাধ্যমিক বয়সী বহু শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো বাস্তুচ্যুত শিক্ষার্থীদের অনেকেই আগের স্কুলের প্রয়োজনীয় সনদ বা নথি না থাকায় নতুন কোনো স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না।২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর, লাখ লাখ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জন করেন। পরবর্তীতে তাদের জন্য বিকল্প শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলে জান্তাবিরোধী ছায়া সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)। মধ্য মিয়ানমারের প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এই ব্যবস্থার অধীনে প্রায় ৬ হাজার স্কুলে ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে।তবে জান্তা বাহিনীর উপর্যুপরি বিমান ও স্থল হামলার কারণে এই বিকল্প ব্যবস্থাও এখন চরম ঝুঁকিতে। সাগাইং অঞ্চলের খিন ইউ টাউনশিপের শিক্ষা কমিটির এক সদস্য জানান, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে আবার জান্তা-নিয়ন্ত্রিত স্কুলেই ফিরে যাচ্ছে, কারণ সেখানে অন্তত বিমান হামলার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।মিয়ানমারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে সামরিক জান্তার নির্বিচার হামলা পরিস্থিতিকে আরও বিষিয়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে সাগাইং অঞ্চলের দেপায়িন টাউনশিপে এনইউজি পরিচালিত একটি স্কুলে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমানের হামলায় ২২ জন শিক্ষার্থী ও ২ জন শিক্ষক নিহত হন।ওই ঘটনার পর থেকে দেশটির বহু অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পুরোপুরি অনীহা প্রকাশ করছেন। দেপায়িনের এক অভিভাবক জানান, তিনি আর তার ছেলেকে স্কুলে পাঠাবেন না। তিনি বলেন, সে ইংরেজি আর বার্মিজ পড়তে-লিখতে পারলেই যথেষ্ট। পরে তাকে কোনো কারিগরি কাজে দিয়ে দেব।মানবাধিকার সংস্থা মিয়ানমার উইটনেস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ১৭৪টি বড় ধরনের হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার বড় অংশই ঘটেছে সাগাইং অঞ্চলে।[TECHTARANGA-POST:953]এদিকে, মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশের এই শিক্ষা ঘাটতিকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিরোধের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বললেও, বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। আইএসপি–মিয়ানমারের প্রতিবেদন বলছে, শিক্ষাখাতে জান্তা সরকারের সরকারি ব্যয় এখনো অভ্যুত্থান-পূর্ব সময়ের চেয়ে অনেক নিচে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বাজেটের মাত্র ৬.০২ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা চলতি বছরে নামমাত্র বাড়িয়ে ৬.৯২ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী এই সংকটের কারণে মিয়ানমারের একটি পুরো প্রজন্ম অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

মিয়ানমারে শিক্ষা বিপর্যয়: নতুন শিক্ষাবর্ষে স্কুলের বাইরে ৬৩ লাখ শিশু