পিরামিড ও গির্জার দেশে মিনারের আলো: মেক্সিকোতে ইসলামের নীরব জাগরণ
মেক্সিকো বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাচীন মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার রহস্যময় পিরামিড, রঙিন লাতিন সংস্কৃতি, মারিয়াচি সঙ্গীত কিংবা আকাশচুম্বী ক্যাথলিক গির্জা। কিন্তু এই চেনা রূপের আড়ালে গত কয়েক দশকে দেশটিতে নীরবে বিকশিত হয়েছে এক নতুন ইতিহাস— ইসলামের ইতিহাস। ১২ কোটিরও বেশি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর এই দেশে আজ ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ইসলামিক সেন্টার, মসজিদ এবং একটি ক্রমবর্ধমান সুসংগঠিত মুসলিম সম্প্রদায়। অভিবাসী আরব ব্যবসায়ী, স্থানীয় ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠী এবং মায়া আদিবাসীদের আত্মিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মেক্সিকোর মাটিতে ইসলামের যে বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ এক সুদৃঢ় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।ইতিহাসবিদদের মতে, মেক্সিকোতে ইসলামের আগমন অনেকের ধারণার চেয়েও পুরোনো। স্পেনীয় ঔপনিবেশিক যুগে কিছু মুসলিম বংশোদ্ভূত মরিস্কো(যাদের জোরপূর্বক খ্রিস্টান করা হয়েছিল) নতুন বিশ্বে প্রবেশ করেছিলেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামের দৃশ্যমান উপস্থিতি শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও তুরস্ক থেকে বহু মানুষ মেক্সিকোতে অভিবাসন করেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই আরব অভিবাসীদের হাত ধরেই মেক্সিকোর মুসলিম সমাজ সংগঠিত হতে শুরু করে। এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৮৯ সালে কোয়াহুইলা অঙ্গরাজ্যের তোরেওন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুরাইয়া মসজিদ— যা আধুনিক মেক্সিকোর প্রথম স্থায়ী মসজিদ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখায়।মেক্সিকোতে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৯৪ সালে, চিয়াপাস অঞ্চলের আদিবাসী মায়া সম্প্রদায়ের হাত ধরে। তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার পর তজোতজিল (Tzotzil) মায়া জনগোষ্ঠীর বহু পরিবার স্পেনের গ্রানাডা থেকে আসা মুসলিম দাঈদের সংস্পর্শে আসেন। ইসলামের সরলতা, কঠোর একত্ববাদ এবং সমতার নৈতিক জীবনব্যবস্থায় মুগ্ধ হয়ে তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন। বর্তমানে সান ক্রিস্তোবাল দে লাস কাসাস অঞ্চলটি মেক্সিকোর অন্যতম প্রধান মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়েছে, যেখানে আদিবাসী মুসলিমরা নিজস্ব কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি আদর্শ সামাজিক জীবনধারা গড়ে তুলেছেন।মেক্সিকোর একটি বিশেষ আইনি ব্যবস্থার কারণে মুসলিমদের বেশ চতুরতার সাথে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। দেশটির আইন অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত ভবন সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির আওতায় চলে যেতে পারে। এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে সুযোগে রূপান্তর করে মেক্সিকোর মুসলিমরা তাদের মসজিদগুলোকে বহুমুখী কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এখানে শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই নয়, বরং ইসলামিক শিক্ষা, আরবি ভাষা চর্চা, সমাজকল্যাণমূলক প্রশিক্ষণ এবং দাতব্য কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয়।[TECHTARANGA-POST:924]বর্তমানে মেক্সিকোজুড়ে ৪০টিরও বেশি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সংখ্যায় এখনও কম হলেও মেক্সিকোতে ইসলাম এখন অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম। মূলত তিনটি কারণে দেশটিতে ইসলামের বিস্তার ঘটছে— আধ্যাত্মিক শূন্যতা পূরণ, ইসলামের সর্বজনীন সমতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে এর সুন্দর সমন্বয়। পিরামিড আর ক্যাথেড্রালের দেশটিতে আজ যখন মিনার থেকে তাওহীদের আজান ধ্বনিত হয়, তখন তা প্রমাণ করে যে সত্যের আহ্বান কোনো ভৌগোলিক সীমানা কিংবা সাংস্কৃতিক প্রাচীর মানে না। আরব অভিবাসীদের হাত ধরে শুরু হওয়া যে যাত্রা আজ মায়া আদিবাসীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে, তা লাতিন আমেরিকার বুকে ইসলামের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে।