বর্তমান যুগে মোবাইল ইন্টারনেট আর কোনো বিলাসিতা বা বাড়তি সুবিধা নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং, সন্তানদের ডিজিটাল শিক্ষা, চাকরির আবেদন কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার গতি সচল রাখা—সবকিছুই এখন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই সেবার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ক্ষোভ ও ভোগান্তি। গত সাড়ে পাঁচ বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে ৬৬ হাজারের বেশি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের সিংহভাগই দুর্বল নেটওয়ার্ক ও নিম্নমানের সেবা সম্পর্কিত, যা রূপকল্প ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক।বিগত দেড় বছরে দেশের প্রধান চার অপারেটরই বিভিন্ন মেয়াদী ডেটা প্যাকেজের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। ব্যান্ডউইথের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় খরচ কমার পরও গ্রাহক পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্য বৃদ্ধি পেলেও সেবার গুণগত মানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। স্বাধীন জরিপ ও পরীক্ষায় অপারেটরদের দাবিকৃত সেবার মানের সাথে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের ব্যবধান স্পষ্ট হয়েছে। শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল—সবখানেই বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া বা ‘কলড্রপ’ এখন নিত্যদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে।শহরাঞ্চলের বাইরে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ফোরজি নেটওয়ার্কের প্রচার থাকলেও গ্রাহকেরা বাস্তবে টুজি বা থ্রিজি মানের গতি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ফাইল ডাউনলোড করতে গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটছেন, কিংবা ফ্রিল্যান্সার সংযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্লায়েন্ট হারাচ্ছেন—এ চিত্র এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মূলত পর্যাপ্ত টাওয়ার না থাকা এবং অবকাঠামোগত ঘাটতিই শহর ও গ্রামের ডিজিটাল বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।বাজার ব্যবস্থায় সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার অভাব এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অপারেটররা নিজেদের ইচ্ছেমতো জটিল ও অগণিত প্যাকেজ চাপিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম বৈষম্যমূলক নিয়ম হলো নির্দিষ্ট মেয়াদের পর অব্যবহৃত ডেটা বাজেয়াপ্ত করা। একজন গ্রাহকের কষ্টের টাকায় কেনা ডেটা বিদ্যুৎ মিটারের মতো সংরক্ষিত না থেকে মেয়াদ শেষে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে পুনর্বার একই প্যাকেজ কেনার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে সাধারণ গ্রাহক খুব একটা উপকৃত হচ্ছেন না।এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের পথ অবশ্য অসম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের ন্যায় দেশে দ্রুত ‘ডেটা রোলওভার’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে অব্যবহৃত ডেটা পরবর্তী মেয়াদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। পাশাপাশি মেয়াদহীন পূর্ণমূল্যের ডেটা প্যাকেজের বিকল্প উন্মুক্ত করা যেতে পারে। প্রতিটি অপারেটরের বিলিং ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে নিয়মিত অডিট করা এবং কলড্রপ বা নিম্নমানের সেবার জন্য শুধু নোটিশ না দিয়ে কার্যকর জরিমানা আরোপ করা জরুরি।[TECHTARANGA-POST:1295]দেশ যখন প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, তখন টেলিযোগাযোগ খাতের এই অস্বচ্ছতা ও নিম্নমানের সেবা সামগ্রিক অগ্রগতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। গ্রাহকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা এবং টেলিকম খাতে সঠিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি; তা না হলে ডিজিটাল অগ্রযাত্রার স্বপ্নটি বাস্তব রূপ না পেয়ে কেবল একটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।