মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

সাজেকের শেষ প্রান্তে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক: মাত্র ৩০ টাকায় মেঘের রাজ্যে আদিম সংস্কৃতির খোঁজ!

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি—মানেই পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা এক টুকরো নীল আকাশ। যেখানে সবুজ পাহাড় আর তুলোর মতো নরম মেঘ প্রতিনিয়ত মিশে যায় একই ক্যানভাসে। এই মেঘের রাজ্যের শেষ প্রান্তে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এক অনন্য আয়োজন, যার নাম লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক। পাহাড়ি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং বিলুপ্তপ্রায় লুসাই নৃগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে পর্যটকদের কাছে জীবন্তভাবে তুলে ধরতে এই পার্কটি এক অনন্য সেতু হিসেবে কাজ করছে।আজকের যান্ত্রিক জীবনে সাজেক ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য এই পার্কটি এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। মাত্র ৩০ টাকার প্রবেশ টিকিট কাটলেই দর্শনার্থীরা এক পলকে দেখতে পাবেন লুসাই সম্প্রদায়ের বসবাসের ধরন, সংস্কৃতি, পোশাক, ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও তাদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।পার্কটিতে পা রাখলেই মনে হবে আপনি যেন দেড়-দুই শ বছর আগের কোনো এক প্রাচীন লুসাই গ্রামে চলে গেছেন। পার্কের মূল আকর্ষণ হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী কাঠের মাচাং ঘর এবং প্রাচীন জলবুক বা যুদ্ধঘর। পার্কের ভেতর যত্নে সাজিয়ে রাখা আছে লুসাইদের প্রাচীন জীবনযাত্রার বিভিন্ন উপাদান; যার মধ্যে রয়েছে শিকারের প্রাচীন সরঞ্জাম, জুমচাষের যন্ত্রপাতি এবং রান্নাবান্নার ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্র। পুরো পার্কটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং এর চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য এককথায় চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো।ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, লুসাই জনগোষ্ঠী মূলত ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন রাজ্য থেকে প্রায় দেড় থেকে দুই শ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি গড়ে তোলে। ব্রিটিশ আমলে সাজেকসংলগ্ন এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।নামের অর্থ: লুসাই শব্দের অর্থ বেশ চমৎকার। এখানে লু মানে মাথা এবং সাই মানে লম্বা বা দীর্ঘ। অর্থাৎ দীর্ঘকায় বা উঁচু মাথার মানুষ হলেন লুসাইরা।বর্তমান অবস্থা: একসময় এই অঞ্চলে লুসাইদের বিশাল জনসংখ্যা থাকলেও পরবর্তীতে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধার টানে তাদের একটি বড় অংশ ভারতের মিজোরামে ফিরে যায়। বর্তমানে সাজেকে টিকে থাকা অল্প কিছু পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও জীবনধারা তুলে ধরতেই এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে।লুসাইরা মূলত গান ও নাচ পছন্দ করা এক উৎসবপ্রিয় জাতি। এই পার্কের অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ হলো—এখানে মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে পর্যটকেরা লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরে ছবি তোলার সুযোগ পান।লুসাই জনগোষ্ঠীর প্রধান উৎসবের নাম চাপচারকূত। সাধারণত বসন্তকালে, বিশেষ করে মার্চ মাসে এই উৎসবটি ধুমধাম করে পালন করা হয়। উৎসবপ্রিয় এই জাতির আছে অত্যন্ত ছন্দময় ও জনপ্রিয় চেরাও নাচ, যা সমতলে বাঁশ নাচ নামে পরিচিত।এই মেঘের রাজ্যের আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে পাহাড়ে রাত যাপনের মাঝে। নিস্তব্ধ পাহাড়ি রাতে ঝিঁঝি পোকার ডাক আর হিমেল হাওয়ার যুগলবন্দী যেকোনো পর্যটককে নিয়ে যাবে এক মায়াবী জগতে। আর ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই কটেজগুলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখের সামনে মেঘের সমুদ্র ভেসে বেড়ানো দেখার স্বর্গীয় অনুভূতি সাজেক ভ্রমণকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি আসতে হবে। এরপর খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সাজেকগামী লোকাল চাঁদের গাড়ি (জিপ) বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে পৌঁছাতে হবে সাজেক ভ্যালিতে। সাজেকের বিখ্যাত রুইলুই পাড়া পার হয়ে একটু গেলেই দেখা মিলবে এই চমৎকার পার্কটির।সাজেক কিংবা লুসাই গ্রাম ভ্রমণের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই সময়টা সবচেয়ে উপযুক্ত। বর্ষার ঠিক পর পর চারপাশের পাহাড়গুলো যেমন গাঢ় সবুজ থাকে, তেমনি মেঘও খুব কাছ থেকে ধরা দেয়। আর যদি লুসাইদের উৎসবের আমেজ পেতে চান, তবে বসন্তের শুরুতে (মার্চ মাসে) যাওয়া ভালো।

সাজেকের শেষ প্রান্তে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক: মাত্র ৩০ টাকায় মেঘের রাজ্যে আদিম সংস্কৃতির খোঁজ!