ফরিদপুরে কৃষিতে নতুন দিগন্ত: সালথায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ!
ঐতিহ্যগতভাবে ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের জন্য পরিচিত জেলা ফরিদপুরে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে এবার জেলার সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ শুরু হয়েছে। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের সাহসী কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির মোট ৮ বিঘা জমিতে এই বিশাল আনারসের বাগান গড়ে তুলে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন ও আলোচনার সৃষ্টি করেছেন।স্থানীয় কৃষক সমাজ এবং কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এর আগে কখনো এত বড় পরিসরে আনারসের চাষ দেখা যায়নি। মিলন ফকিরের এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে যেমন নতুন মাত্রা যুক্ত হবে, তেমনি সাধারণ কৃষকদের জন্য বিকল্প ও উচ্চ লাভজনক ফল চাষের এক নতুন পথ উন্মুক্ত হবে।সরেজমিনে যদুনন্দী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে নিয়মিত পরিচর্যা চালাচ্ছেন শ্রমিকেরা। দূর থেকে সবুজের সমারোহে ভরা এই দৃষ্টিনন্দন বাগানটি যে কারও চোখ জুড়িয়ে দেয়।বাগানটির উৎপত্তির নেপথ্য গল্প জানতে চাইলে মিলন ফকির জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার ভাবনা থেকে প্রায় দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারসের গাছ লাগান। সেখানে আশাতীত ভালো ফলন পাওয়ায় তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং তিনি মাঠপর্যায়ে বড় পরিসরে চাষের সিদ্ধান্ত নেন।চলতি বছরে তিনি আনারস চাষের জন্য বিখ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার চারা সংগ্রহ করেন এবং তা ৮ বিঘা জমিতে রোপণ করেন। চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ, সার ও শ্রমিকসহ এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বাগানের গাছগুলো বর্তমানে বেশ সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রথম বছরেই প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।সালথা এলাকায় এর আগে কখনো আনারস চাষ না হওয়ায় এই বাগানটি দেখতে প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও শত শত সাধারণ মানুষ ও কৃষকেরা ভিড় করছেন।স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান ও মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সাধারণত ঐতিহ্যগতভাবে ধান, পাট আর পেঁয়াজ-সবজি চাষ করি। আনারস যে আমাদের মাটিতে এভাবে চাষ করা সম্ভব, তা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের এই সুন্দর বাগান দেখে আমাদেরও আগ্রহ বাড়ছে। ফলন ভালো ও লাভজনক হলে আমরাও আগামীতে এই ফল চাষ শুরু করব। শুধু ফল বিক্রিই নয়, মিলন ফকিরের ভবিষ্যতে নিজ বাগানেই উন্নত জাতের আনারসের চারা উৎপাদন ও স্থানীয় কৃষকদের কাছে সুলভ মূল্যে বিক্রি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।আনারস একটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং বাজারে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ফল। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ফরিদপুরের মাটি ও জলবায়ু এই চাষের জন্য উপযুগী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, সালথায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যাঞ্জক একটি উদ্যোগ। আমাদের কৃষি অফিস থেকে মিলন ফকিরকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। কৃষিতে এই বহুমুখীকরণ নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে বড় ভূমিকা রাখবে।ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন এই পদক্ষেপকে ‘যুগান্তকারী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, আমাদের জেলায় সাধারণত সনাতনী ফসলের প্রচলন বেশি। তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কৃষির আধুনিকায়ন ও আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের বাগানের বর্তমান অবস্থা খুবই সন্তোষজনক। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে এটি ফরিদপুরের কৃষি অর্থনীতিতে এক বড় ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।[TECHTARANGA-POST:929]প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে মিলন ফকিরের এই সাহসী ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ ফরিদপুরের কৃষি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে, যা জেলার হাজারো কৃষকের আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।