মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সম্পাদকীয়

ছোট অভ্যাসের বড় শক্তি ও নাগরিক চরিত্র

ছোট অভ্যাসের বড় শক্তি ও নাগরিক চরিত্র

চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর এখন শেষের পথে। মাঠের জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশের বাইরেও এই বিশ্বমঞ্চ আমাদের মানবতাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা ও নাগরিক দায়িত্বের এক বড় বার্তা দিয়ে যায়। প্রতিবারের মতো এবারও গ্যালারিতে জাপানি দর্শকদের একটি চিরচেনা আচরণ বিশ্বের নজর কেড়েছে—খেলা শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে তাঁরা পুরো গ্যালারি নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করেছেন। এই কাজের জন্য তাঁদের কোনো বাহ্যিক পুরস্কার বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা ছিল না। স্রেফ নিজেদের তাড়না থেকেই তাঁরা এটি করেছেন। আসলে যেকোনো ভালো কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মনের গভীরের এক অনাবিল প্রশান্তি। লোকদেখানো প্রশংসা নয়, এই আত্মতৃপ্তিই মানুষের ভেতরে একটি ইতিবাচক মানসিকতার বীজ বুনে দেয়।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, যেকোনো ভালো কাজের প্রথম সুফল পান যিনি কাজটি করছেন তিনি নিজেই। কল্যাণকর কোনো কাজে যুক্ত হলে মানুষের মনে যে স্বস্তি তৈরি হয়, তা ক্রমান্বয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। এই আত্মবিশ্বাসের হাত ধরেই মানুষ যূথবদ্ধভাবে আরও বড় কোনো ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, সামাজিক দায়িত্ব পালন কিংবা অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট ছোট চর্চা মানুষের মানসিক অবসাদ দূর করে, জীবনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনে এবং সুখের অনুভূতি বাড়ায়। ফলে, ভালো কাজ শুধু সমাজের উপকার করে না, ব্যক্তির নিজের মনকেও সুন্দর করে।

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে নেতিবাচক মানসিকতা দিন দিন জেঁকে বসছে। ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার চেয়ে অন্যের ভুলত্রুটি ও খামতি খোঁজার প্রতিই মানুষের আগ্রহ যেন বেশি। হিংসা, পরশ্রীকাতরতা আর পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি আমাদের চেনা পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। অথচ সমাজকে বদলে দিতে খুব বড় বিপ্লবের প্রয়োজন নেই। রাস্তায় ময়লা না ফেলা, সংকটে পড়া কোনো মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, একটি গাছ লাগানো কিংবা কারও ভালো কাজের অকপটে একটু তারিফ করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপই চারপাশের মানুষকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলতে পারে। একটি জ্বলন্ত প্রদীপ যেভাবে আরেকটি প্রদীপকে আলো দেয়, তেমনি একটি ভালো চিন্তাও বহুজনের মনে শুভবুদ্ধির উদয় ঘটাতে সক্ষম।

এ কারণেই ইসলামের দৃষ্টিতেও ভালো চিন্তাকে ভালো কাজের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা যিলযালের ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ এই অমোঘ বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো ভালো কাজই আসলে ছোট বা ফেলনা নয়। সমাজজীবনে এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। মহানবীও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালো কাজকে ছোট করে দেখতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ, সুকর্মের আসল সার্থকতা বাইরের করতালিতে নয়, তা লুকিয়ে থাকে অন্তরের গভীর সন্তুষ্টিতে।

পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের সমৃদ্ধির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, তারা কেবল বড় বড় বুলি আউড়ে আজকের অবস্থানে আসেনি। বরং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ভালো অভ্যাস ও শৃঙ্খলাকে তারা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, পরোপকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই শেষ পর্যন্ত তাদের জাতীয় শক্তির মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আমাদেরও এখন সেই পথে হাঁটার সময় এসেছে।

আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ দিয়ে আমাদের দিনটি শুরু করতে পারি, তবে তার ইতিবাচক প্রভাব প্রথমে আমাদের পরিবারে এবং পরবর্তীতে সমাজ ও রাষ্ট্রে পড়তে বাধ্য। বিন্দু বিন্দু জল জমে যেভাবে মহাসমুদ্র তৈরি হয়, ঠিক তেমনি নাগরিকদের ছোট ছোট সুঅভ্যাসের সমন্বয়েই একটি মর্যাদাবান জাতির জন্ম হয়। কেবল আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কোনো জাতির শ্রেষ্ঠত্ব মাপা যায় না, তা পরিমাপ করতে হয় নাগরিকদের উন্নত চরিত্র দিয়ে। আর সেই চরিত্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট সৎকর্মের ভেতর দিয়েই। ভালো কাজের আসল পুরস্কার হলো, তা মানুষকে আরও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আজকের সংকটে এই ইতিবাচক মানসিকতার চর্চা আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


ছোট অভ্যাসের বড় শক্তি ও নাগরিক চরিত্র

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর এখন শেষের পথে। মাঠের জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশের বাইরেও এই বিশ্বমঞ্চ আমাদের মানবতাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা ও নাগরিক দায়িত্বের এক বড় বার্তা দিয়ে যায়। প্রতিবারের মতো এবারও গ্যালারিতে জাপানি দর্শকদের একটি চিরচেনা আচরণ বিশ্বের নজর কেড়েছে—খেলা শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে তাঁরা পুরো গ্যালারি নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করেছেন। এই কাজের জন্য তাঁদের কোনো বাহ্যিক পুরস্কার বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা ছিল না। স্রেফ নিজেদের তাড়না থেকেই তাঁরা এটি করেছেন। আসলে যেকোনো ভালো কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মনের গভীরের এক অনাবিল প্রশান্তি। লোকদেখানো প্রশংসা নয়, এই আত্মতৃপ্তিই মানুষের ভেতরে একটি ইতিবাচক মানসিকতার বীজ বুনে দেয়।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, যেকোনো ভালো কাজের প্রথম সুফল পান যিনি কাজটি করছেন তিনি নিজেই। কল্যাণকর কোনো কাজে যুক্ত হলে মানুষের মনে যে স্বস্তি তৈরি হয়, তা ক্রমান্বয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। এই আত্মবিশ্বাসের হাত ধরেই মানুষ যূথবদ্ধভাবে আরও বড় কোনো ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, সামাজিক দায়িত্ব পালন কিংবা অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট ছোট চর্চা মানুষের মানসিক অবসাদ দূর করে, জীবনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনে এবং সুখের অনুভূতি বাড়ায়। ফলে, ভালো কাজ শুধু সমাজের উপকার করে না, ব্যক্তির নিজের মনকেও সুন্দর করে।

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে নেতিবাচক মানসিকতা দিন দিন জেঁকে বসছে। ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার চেয়ে অন্যের ভুলত্রুটি ও খামতি খোঁজার প্রতিই মানুষের আগ্রহ যেন বেশি। হিংসা, পরশ্রীকাতরতা আর পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি আমাদের চেনা পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। অথচ সমাজকে বদলে দিতে খুব বড় বিপ্লবের প্রয়োজন নেই। রাস্তায় ময়লা না ফেলা, সংকটে পড়া কোনো মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, একটি গাছ লাগানো কিংবা কারও ভালো কাজের অকপটে একটু তারিফ করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপই চারপাশের মানুষকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলতে পারে। একটি জ্বলন্ত প্রদীপ যেভাবে আরেকটি প্রদীপকে আলো দেয়, তেমনি একটি ভালো চিন্তাও বহুজনের মনে শুভবুদ্ধির উদয় ঘটাতে সক্ষম।

এ কারণেই ইসলামের দৃষ্টিতেও ভালো চিন্তাকে ভালো কাজের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা যিলযালের ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ এই অমোঘ বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো ভালো কাজই আসলে ছোট বা ফেলনা নয়। সমাজজীবনে এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। মহানবীও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালো কাজকে ছোট করে দেখতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ, সুকর্মের আসল সার্থকতা বাইরের করতালিতে নয়, তা লুকিয়ে থাকে অন্তরের গভীর সন্তুষ্টিতে।

পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের সমৃদ্ধির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, তারা কেবল বড় বড় বুলি আউড়ে আজকের অবস্থানে আসেনি। বরং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ভালো অভ্যাস ও শৃঙ্খলাকে তারা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, পরোপকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই শেষ পর্যন্ত তাদের জাতীয় শক্তির মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আমাদেরও এখন সেই পথে হাঁটার সময় এসেছে।

আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ দিয়ে আমাদের দিনটি শুরু করতে পারি, তবে তার ইতিবাচক প্রভাব প্রথমে আমাদের পরিবারে এবং পরবর্তীতে সমাজ ও রাষ্ট্রে পড়তে বাধ্য। বিন্দু বিন্দু জল জমে যেভাবে মহাসমুদ্র তৈরি হয়, ঠিক তেমনি নাগরিকদের ছোট ছোট সুঅভ্যাসের সমন্বয়েই একটি মর্যাদাবান জাতির জন্ম হয়। কেবল আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কোনো জাতির শ্রেষ্ঠত্ব মাপা যায় না, তা পরিমাপ করতে হয় নাগরিকদের উন্নত চরিত্র দিয়ে। আর সেই চরিত্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট সৎকর্মের ভেতর দিয়েই। ভালো কাজের আসল পুরস্কার হলো, তা মানুষকে আরও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আজকের সংকটে এই ইতিবাচক মানসিকতার চর্চা আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো