মাছে-ভাতে বাঙালি—ঐতিহ্যবাহী এই প্রবাদটি আজ ক্রমশ ফিকে হতে চলেছে। একসময় দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুরে যেসব দেশি প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য ছিল, তার বড় একটি অংশ আজ দেশীয় বাজারে একপ্রকার বিরল। শোল, গজার, চিতল, বোয়াল, পাবদা, টেংরা, কাচকি কিংবা কই-শিংয়ের মতো স্বাদ ও পুষ্টিগুণে ভরা মাছগুলো এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দেশীয় বাজারে যখন সাধারণ মানুষ চড়া দামের কারণে এসব মাছ পাতে তুলতে পারছে না, তখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এসব দেশি মাছের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে।
রপ্তানি আয় নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) তথ্যমতে, আমাদের ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে অন্তত ১২টি প্রজাতি চরম বিপন্ন এবং ১৪টি প্রজাতি সংকটাপন্ন। মানবসৃষ্ট অবহেলা, প্রাকৃতিক জলাশয় ও প্লাবনভূমি দখল, বিষাক্ত কেমিক্যাল ও কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের কারণে দেশি মাছের স্বাভাবিক প্রজনন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
দেশি মাছের বাজারে এই সঙ্কটের আরেকটি বড় কারণ সঠিক পরিবহন ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত হিমাগার ও আধুনিক পরিবহন সুবিধার অভাবে ধরা পড়া মাছের প্রায় ৩০ শতাংশ বাজারে পৌঁছানোর আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায়। এতে বছরে দেশ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এই অপচয় বন্ধ করা গেলে দেশীয় চাহিদা মেটানো অনেকাংশে সহজ হতো।
দেশি ছোট মাছে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও ভিটামিন; যা গর্ভবতী নারী ও শিশুদের অন্ধত্ব ও রক্তশূন্যতার মতো ব্যাধি প্রতিরোধে অপরিহার্য। তাই আমিষের এই প্রাকৃতিক উৎস রক্ষা করা কেবল স্বাদের বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তাতেও অত্যন্ত জরুরি।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অবিলম্বে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমত, মৎস্য আইনের কঠোর প্রয়োগ ও অভয়াশ্রম রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাটকা রক্ষা ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার জিরো টলারেন্সে আনতে হবে। পাশাপাশি ধানক্ষেতে মিনি পুকুর খনন ও বৈজ্ঞানিক প্রথা মেনে মিশ্র মাছ চাষে খামারিদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, জলাশয় ও প্লাবনভূমি রক্ষা এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে ‘দেশি মাছ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন’ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। মৎস্যবান্ধব নীতি ও টেকসই অবকাঠামোর সফল বাস্তবায়নই পারে আমাদের ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাছে-ভাতে বাঙালি—ঐতিহ্যবাহী এই প্রবাদটি আজ ক্রমশ ফিকে হতে চলেছে। একসময় দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুরে যেসব দেশি প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য ছিল, তার বড় একটি অংশ আজ দেশীয় বাজারে একপ্রকার বিরল। শোল, গজার, চিতল, বোয়াল, পাবদা, টেংরা, কাচকি কিংবা কই-শিংয়ের মতো স্বাদ ও পুষ্টিগুণে ভরা মাছগুলো এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দেশীয় বাজারে যখন সাধারণ মানুষ চড়া দামের কারণে এসব মাছ পাতে তুলতে পারছে না, তখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এসব দেশি মাছের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে।
রপ্তানি আয় নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) তথ্যমতে, আমাদের ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে অন্তত ১২টি প্রজাতি চরম বিপন্ন এবং ১৪টি প্রজাতি সংকটাপন্ন। মানবসৃষ্ট অবহেলা, প্রাকৃতিক জলাশয় ও প্লাবনভূমি দখল, বিষাক্ত কেমিক্যাল ও কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের কারণে দেশি মাছের স্বাভাবিক প্রজনন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
দেশি মাছের বাজারে এই সঙ্কটের আরেকটি বড় কারণ সঠিক পরিবহন ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত হিমাগার ও আধুনিক পরিবহন সুবিধার অভাবে ধরা পড়া মাছের প্রায় ৩০ শতাংশ বাজারে পৌঁছানোর আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায়। এতে বছরে দেশ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এই অপচয় বন্ধ করা গেলে দেশীয় চাহিদা মেটানো অনেকাংশে সহজ হতো।
দেশি ছোট মাছে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও ভিটামিন; যা গর্ভবতী নারী ও শিশুদের অন্ধত্ব ও রক্তশূন্যতার মতো ব্যাধি প্রতিরোধে অপরিহার্য। তাই আমিষের এই প্রাকৃতিক উৎস রক্ষা করা কেবল স্বাদের বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তাতেও অত্যন্ত জরুরি।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অবিলম্বে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমত, মৎস্য আইনের কঠোর প্রয়োগ ও অভয়াশ্রম রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাটকা রক্ষা ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার জিরো টলারেন্সে আনতে হবে। পাশাপাশি ধানক্ষেতে মিনি পুকুর খনন ও বৈজ্ঞানিক প্রথা মেনে মিশ্র মাছ চাষে খামারিদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, জলাশয় ও প্লাবনভূমি রক্ষা এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে ‘দেশি মাছ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন’ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। মৎস্যবান্ধব নীতি ও টেকসই অবকাঠামোর সফল বাস্তবায়নই পারে আমাদের ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে।

আপনার মতামত লিখুন