মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

জ্বালানি রাজনীতি ও ভারতের দোটানা: কৌশলী ভারসাম্য নাকি নতিস্বীকার?

জ্বালানি রাজনীতি ও ভারতের দোটানা: কৌশলী ভারসাম্য নাকি নতিস্বীকার?

ভারত কার কাছ থেকে তেল কিনবে—প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে স্রেফ অর্থনৈতিক মনে হলেও এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনীতি। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের জ্বালানি নীতি এখন আর কেবল বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সার্বভৌমত্বের এক অগ্নিপরীক্ষা।

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সমীকরণটি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: সাশ্রয়ী দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সমীকরণটি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে রাশিয়ার সস্তা তেলের হাতছানি, অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের শুল্কনীতির খড়্গ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট দিল্লি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। কিন্তু যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ তেল আমদানি শুরু করে। এই সিদ্ধান্তটি ছিল নিরেট বাস্তববাদী। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন’ (IEEPA) ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কের হুমকি ভারতকে চাপে ফেলে দেয়। আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি ছিল দিল্লির প্রতি ওয়াশিংটনের এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এই পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে আইনি বিতর্কে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যখন আইইইপিএ আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তখন দিল্লির সামনে এক বড় নৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ ধরে রাখতে পারবে? দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতা বা ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ নীতি কি মার্কিন চাপের মুখে নড়বড়ে হয়ে পড়ছে? বাস্তবতা হলো, ভারত এখন এক সরু সুতার ওপর দিয়ে হাঁটছে। দেশটি রাশিয়ার তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেনি, আবার যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরাক থেকে আমদানি বাড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। কেপলারের তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও ভারত প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে। মোদি সরকার একে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে অভিহিত করলেও বিরোধীদের দাবি, এটি বিদেশি চাপের কাছে নতিস্বীকার। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেমন জরুরি, তেমনি রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান মেরুকৃত বিশ্বে তেল এখন কেবল একটি পণ্য নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। ভারত কি শেষ পর্যন্ত কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হবে, নাকি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। দিল্লির এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যের লড়াই কেবল ভারতের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক বড় সংকেত। নাহিদ হোসেন সম্পাদক, দৈনিক নতুন আলো।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


জ্বালানি রাজনীতি ও ভারতের দোটানা: কৌশলী ভারসাম্য নাকি নতিস্বীকার?

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারত কার কাছ থেকে তেল কিনবে—প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে স্রেফ অর্থনৈতিক মনে হলেও এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনীতি। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের জ্বালানি নীতি এখন আর কেবল বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সার্বভৌমত্বের এক অগ্নিপরীক্ষা।

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সমীকরণটি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: সাশ্রয়ী দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সমীকরণটি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে রাশিয়ার সস্তা তেলের হাতছানি, অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের শুল্কনীতির খড়্গ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট দিল্লি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। কিন্তু যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ তেল আমদানি শুরু করে। এই সিদ্ধান্তটি ছিল নিরেট বাস্তববাদী। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন’ (IEEPA) ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কের হুমকি ভারতকে চাপে ফেলে দেয়। আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি ছিল দিল্লির প্রতি ওয়াশিংটনের এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এই পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে আইনি বিতর্কে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যখন আইইইপিএ আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তখন দিল্লির সামনে এক বড় নৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ ধরে রাখতে পারবে? দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতা বা ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ নীতি কি মার্কিন চাপের মুখে নড়বড়ে হয়ে পড়ছে? বাস্তবতা হলো, ভারত এখন এক সরু সুতার ওপর দিয়ে হাঁটছে। দেশটি রাশিয়ার তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেনি, আবার যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরাক থেকে আমদানি বাড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। কেপলারের তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও ভারত প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে। মোদি সরকার একে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে অভিহিত করলেও বিরোধীদের দাবি, এটি বিদেশি চাপের কাছে নতিস্বীকার। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেমন জরুরি, তেমনি রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান মেরুকৃত বিশ্বে তেল এখন কেবল একটি পণ্য নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। ভারত কি শেষ পর্যন্ত কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হবে, নাকি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। দিল্লির এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যের লড়াই কেবল ভারতের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক বড় সংকেত। নাহিদ হোসেন সম্পাদক, দৈনিক নতুন আলো।

দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো