কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে একসময় বাঙালির একমাত্র স্বস্তির নাম ছিল তালপাতার পাখা। বিদ্যুৎহীন নিঝুম রাতে মা-ঠাকুমাদের হাতের সেই পাখার বাতাস জুড়িয়ে দিত প্রাণ। তবে কালের বিবর্তনে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আর ঘরে ঘরে এসির বাতাসে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই চিরচেনা লোকশিল্প। তীব্র এই বিলুপ্তির স্রোতে দাঁড়িয়েও নারায়ণগঞ্জের একটি পরিবার তিন পুরুষ ধরে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তালপাতার পাখার ব্যবসা। তবে শেষ রক্ষা বুঝি আর হলো না! পরিবারের বর্তমান কাণ্ডারির আক্ষেপ— তাঁর মৃত্যুর পর হয়তো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে ১২০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যের দুয়ার।
নারায়ণগঞ্জ শহরের ২ নম্বর বাবুরাইল এলাকায় গেলেই যে কেউ দেখিয়ে দেবে একটি বাড়ি। পাড়া-পড়শী থেকে শুরু করে চেনা-জানাদের কাছে বাড়িটির একটাই পরিচয়— পাখাওয়ালা বাড়ি। এই বাড়ির বর্তমান বাসিন্দা মো. ইউসুফ বেপারী। তাঁর শিরায় শিরায় বইছে এই শিল্পের রক্ত।
ইউসুফ বেপারীর পরিবারে তালপাতার পাখার এই ব্যবসা আজকের নয়, এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে সুদূর ব্রিটিশ আমলে। ইউসুফ বেপারীর আগে তাঁর বাবা, বাবার আগে তাঁর দাদা এবং তারও আগে দাদার বাবা এই ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও গত ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই পেশাকেই ভালোবেসে এসেছেন তাঁরা।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মো. ইউসুফ ব্যাপারী বলেন—
আমাদের এই ব্যবসা ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে। আমার দাদা-পরদাদারা যখন এই পাখা বিক্রি করতেন, তখন প্রতিটির দাম ছিল মাত্র চার থেকে ছয় আনা। তখন দেশে বিদ্যুৎ ছিল না বললেই চলে, ফলে গরমের দিনে পাখার চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। আগে আমরা বছরে এক থেকে দেড় লাখ পর্যন্ত পাখা বিক্রি করতাম। পাইকারদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হতো আমাদের।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে-গঞ্জেও পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। সেই সাথে কমে গেছে কাঁচামাল বা তালগাছের সংখ্যাও। ফলে আগের সেই জৌলুস আর নেই। বর্তমানে একটি পাখা বাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও, তা দিয়ে কোনো রকমে দিন চালানোই দায়।
ইউসুফের স্ত্রী হাসি বেগম, যিনি দীর্ঘ বছর ধরে স্বামীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই ব্যবসা ধরে রেখেছেন, তিনি বলেন— আমি যখন এই পরিবারের বধূ হয়ে আসি, তখন চারদিকে শুধু পাখা আর কারিগরদের মুখরতা দেখেছি। এই পাখা বিক্রির টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলেছে, সন্তানদের মুখে অন্ন উঠেছে। কিন্তু এখন আর আগের মতো পাখা চলে না।
সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা হলো, ইউসুফ বেপারীই হতে যাচ্ছেন এই ১২০ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের শেষ প্রতিনিধি। বর্তমানে বাজারে পাখার কদর না থাকায় এবং এটি লাভজনক পেশা না হওয়ায় ইউসুফের দুই ছেলের কেউই এই ব্যবসার হাল ধরতে রাজি হননি। তারা দুজনেই জড়িয়ে গেছেন অন্য পেশায়। এখন ইউসুফ ব্যাপারী মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো উৎপাদন ও ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ইউসুফ ব্যাপারীর স্পষ্ট ও আকুল স্বীকারোক্তি— আমার মৃত্যুর পর এই পাখার ব্যবসা করার মতো আর কেউ থাকবে না।
নারায়ণগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের করুণ দশার কথা জানতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজউদ্দিন জানান—
যারা আমাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা এমন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী, তাদের জন্য সরকারের বিভিন্ন রকমের সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা মো. ইউসুফ বেপারীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলব। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যদি আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করার সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই আমরা সেই বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেব।
সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কি পারবে ১২০ বছরের এই পাখাওয়ালা বাড়ির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে, নাকি আধুনিকতার গ্লানিতে চিরতরে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের এই সোনালী পাতা— সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।
বিষয় : তিন পুরুষ তালপাতার পাখা ব্যবসা

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে একসময় বাঙালির একমাত্র স্বস্তির নাম ছিল তালপাতার পাখা। বিদ্যুৎহীন নিঝুম রাতে মা-ঠাকুমাদের হাতের সেই পাখার বাতাস জুড়িয়ে দিত প্রাণ। তবে কালের বিবর্তনে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আর ঘরে ঘরে এসির বাতাসে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই চিরচেনা লোকশিল্প। তীব্র এই বিলুপ্তির স্রোতে দাঁড়িয়েও নারায়ণগঞ্জের একটি পরিবার তিন পুরুষ ধরে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তালপাতার পাখার ব্যবসা। তবে শেষ রক্ষা বুঝি আর হলো না! পরিবারের বর্তমান কাণ্ডারির আক্ষেপ— তাঁর মৃত্যুর পর হয়তো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে ১২০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যের দুয়ার।
নারায়ণগঞ্জ শহরের ২ নম্বর বাবুরাইল এলাকায় গেলেই যে কেউ দেখিয়ে দেবে একটি বাড়ি। পাড়া-পড়শী থেকে শুরু করে চেনা-জানাদের কাছে বাড়িটির একটাই পরিচয়— পাখাওয়ালা বাড়ি। এই বাড়ির বর্তমান বাসিন্দা মো. ইউসুফ বেপারী। তাঁর শিরায় শিরায় বইছে এই শিল্পের রক্ত।
ইউসুফ বেপারীর পরিবারে তালপাতার পাখার এই ব্যবসা আজকের নয়, এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে সুদূর ব্রিটিশ আমলে। ইউসুফ বেপারীর আগে তাঁর বাবা, বাবার আগে তাঁর দাদা এবং তারও আগে দাদার বাবা এই ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও গত ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই পেশাকেই ভালোবেসে এসেছেন তাঁরা।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মো. ইউসুফ ব্যাপারী বলেন—
আমাদের এই ব্যবসা ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে। আমার দাদা-পরদাদারা যখন এই পাখা বিক্রি করতেন, তখন প্রতিটির দাম ছিল মাত্র চার থেকে ছয় আনা। তখন দেশে বিদ্যুৎ ছিল না বললেই চলে, ফলে গরমের দিনে পাখার চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। আগে আমরা বছরে এক থেকে দেড় লাখ পর্যন্ত পাখা বিক্রি করতাম। পাইকারদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হতো আমাদের।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে-গঞ্জেও পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। সেই সাথে কমে গেছে কাঁচামাল বা তালগাছের সংখ্যাও। ফলে আগের সেই জৌলুস আর নেই। বর্তমানে একটি পাখা বাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও, তা দিয়ে কোনো রকমে দিন চালানোই দায়।
ইউসুফের স্ত্রী হাসি বেগম, যিনি দীর্ঘ বছর ধরে স্বামীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই ব্যবসা ধরে রেখেছেন, তিনি বলেন— আমি যখন এই পরিবারের বধূ হয়ে আসি, তখন চারদিকে শুধু পাখা আর কারিগরদের মুখরতা দেখেছি। এই পাখা বিক্রির টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলেছে, সন্তানদের মুখে অন্ন উঠেছে। কিন্তু এখন আর আগের মতো পাখা চলে না।
সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা হলো, ইউসুফ বেপারীই হতে যাচ্ছেন এই ১২০ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের শেষ প্রতিনিধি। বর্তমানে বাজারে পাখার কদর না থাকায় এবং এটি লাভজনক পেশা না হওয়ায় ইউসুফের দুই ছেলের কেউই এই ব্যবসার হাল ধরতে রাজি হননি। তারা দুজনেই জড়িয়ে গেছেন অন্য পেশায়। এখন ইউসুফ ব্যাপারী মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো উৎপাদন ও ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ইউসুফ ব্যাপারীর স্পষ্ট ও আকুল স্বীকারোক্তি— আমার মৃত্যুর পর এই পাখার ব্যবসা করার মতো আর কেউ থাকবে না।
নারায়ণগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের করুণ দশার কথা জানতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজউদ্দিন জানান—
যারা আমাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা এমন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী, তাদের জন্য সরকারের বিভিন্ন রকমের সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা মো. ইউসুফ বেপারীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলব। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যদি আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করার সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই আমরা সেই বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেব।
সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কি পারবে ১২০ বছরের এই পাখাওয়ালা বাড়ির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে, নাকি আধুনিকতার গ্লানিতে চিরতরে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের এই সোনালী পাতা— সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।

আপনার মতামত লিখুন