মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সম্পাদকীয়

নারী শিক্ষার দৃশ্যমান অগ্রগতি বনাম শ্রমবাজারের অসম্পূর্ণ সমীকরণ

নারী শিক্ষার দৃশ্যমান অগ্রগতি বনাম শ্রমবাজারের অসম্পূর্ণ সমীকরণ

গত দুই দশকে বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে জেন্ডার সমতা অর্জনে যে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমাদের ক্লাসরুমগুলো আজ ছাত্রীদের উপস্থিতিতে মুখরিত। ডিগ্রি বাড়ছে, সনদের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে নারীদের সামাজিক আকাঙ্ক্ষাও।কিন্তু এই উজ্জ্বল চিত্রের ঠিক উল্টো পিঠে দেশের শ্রমবাজার আমাদের এক ভিন্ন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে নারী শিক্ষার হার বাড়লেও শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার এখনো মাত্র ৩৭ থেকে ৪৪ শতাংশের বৃত্তেই আটকে আছে।

শিক্ষার এই বিপুল জোয়ারকে কেন আমরা জাতীয় উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর করতে পারছি না—তা আজ এক বড় প্রশ্ন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন দর্শন অনুযায়ী, যেকোনো দেশের অগ্রগতি কেবল সুযোগের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই সুযোগকে অর্থপূর্ণ ফলাফলে রূপান্তর করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে নারীরা ডিগ্রি অর্জন করছেন ঠিকই, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের গতিশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কিংবা বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে না। ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি অর্থনীতিতে এক বিশাল শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

এই স্থবিরতার পেছনে কিছু গভীর কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, ঘরের ভেতরের পারিশ্রমিকহীন ও অমূল্যায়িত পারিবারিক যত্ন বা সেবামূলক কাজের সিংহভাগ বোঝা এখনো নারীদেরই বইতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রধান শহরগুলোর বাইরে কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার অভাব এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা। এর বাইরে সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বাজারের বাস্তব চাহিদার তীব্র অমিল। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা এখনো প্রথাগত ও গৎবাঁধা বিষয়ে ডিগ্রি নিচ্ছেন, অথচ বর্তমান যুগের উদীয়মান ও ডিজিটাল খাতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি বা বিশেষায়িত দক্ষতা তাঁদের থাকছে না।

আমরা মনে করি, শিক্ষিত জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে অর্থনৈতিক মূলধারার বাইরে রেখে কোনো দেশের পক্ষেই উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা টেকসই উন্নয়ন বজায় রাখা সম্ভব নয়। এটি কেবল কোনো জেন্ডার ইস্যু বা নারী অধিকারের বিষয় নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা।

এই বৃত্ত থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের বাইরে এসে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা সিস্টেমেটিক শিফট আনতে হবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য সাশ্রয়ী চাইল্ডকেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপন, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশকে শতভাগ নারীবান্ধব করা কোনো সামাজিক বিলাসিতা নয়, বরং এটি এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিক্ষাকে কেবল সনদের বেড়াজালে আটকে না রেখে ভবিষ্যতের ডিজিটাল ও প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা ও দক্ষতায় রূপান্তর করতে হবে।

সর্বোপরি, আমাদের সফলতার পরিমাপের সূচকও বদলাতে হবে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা বা পাসের হার দেখে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার দিন শেষ। এখন থেকে প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত নারীদের কর্মসংস্থানের হার, তাঁদের ক্যারিয়ারের উর্ধ্বমুখী অগ্রগতি এবং উচ্চ-উৎপাদনশীল খাতগুলোতে তাঁদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ। শিক্ষা নারীদের জন্য যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে তার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। অর্জিত শিক্ষা যখন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপ নেবে, তখনই বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গল্পটি পূর্ণতা পাবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নারী শিক্ষার দৃশ্যমান অগ্রগতি বনাম শ্রমবাজারের অসম্পূর্ণ সমীকরণ

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

featured Image

গত দুই দশকে বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে জেন্ডার সমতা অর্জনে যে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমাদের ক্লাসরুমগুলো আজ ছাত্রীদের উপস্থিতিতে মুখরিত। ডিগ্রি বাড়ছে, সনদের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে নারীদের সামাজিক আকাঙ্ক্ষাও।কিন্তু এই উজ্জ্বল চিত্রের ঠিক উল্টো পিঠে দেশের শ্রমবাজার আমাদের এক ভিন্ন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে নারী শিক্ষার হার বাড়লেও শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার এখনো মাত্র ৩৭ থেকে ৪৪ শতাংশের বৃত্তেই আটকে আছে।

শিক্ষার এই বিপুল জোয়ারকে কেন আমরা জাতীয় উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর করতে পারছি না—তা আজ এক বড় প্রশ্ন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন দর্শন অনুযায়ী, যেকোনো দেশের অগ্রগতি কেবল সুযোগের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই সুযোগকে অর্থপূর্ণ ফলাফলে রূপান্তর করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে নারীরা ডিগ্রি অর্জন করছেন ঠিকই, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের গতিশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কিংবা বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে না। ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি অর্থনীতিতে এক বিশাল শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

এই স্থবিরতার পেছনে কিছু গভীর কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, ঘরের ভেতরের পারিশ্রমিকহীন ও অমূল্যায়িত পারিবারিক যত্ন বা সেবামূলক কাজের সিংহভাগ বোঝা এখনো নারীদেরই বইতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রধান শহরগুলোর বাইরে কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার অভাব এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা। এর বাইরে সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বাজারের বাস্তব চাহিদার তীব্র অমিল। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা এখনো প্রথাগত ও গৎবাঁধা বিষয়ে ডিগ্রি নিচ্ছেন, অথচ বর্তমান যুগের উদীয়মান ও ডিজিটাল খাতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি বা বিশেষায়িত দক্ষতা তাঁদের থাকছে না।

আমরা মনে করি, শিক্ষিত জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে অর্থনৈতিক মূলধারার বাইরে রেখে কোনো দেশের পক্ষেই উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা টেকসই উন্নয়ন বজায় রাখা সম্ভব নয়। এটি কেবল কোনো জেন্ডার ইস্যু বা নারী অধিকারের বিষয় নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা।

এই বৃত্ত থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের বাইরে এসে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা সিস্টেমেটিক শিফট আনতে হবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য সাশ্রয়ী চাইল্ডকেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপন, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশকে শতভাগ নারীবান্ধব করা কোনো সামাজিক বিলাসিতা নয়, বরং এটি এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিক্ষাকে কেবল সনদের বেড়াজালে আটকে না রেখে ভবিষ্যতের ডিজিটাল ও প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা ও দক্ষতায় রূপান্তর করতে হবে।

সর্বোপরি, আমাদের সফলতার পরিমাপের সূচকও বদলাতে হবে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা বা পাসের হার দেখে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার দিন শেষ। এখন থেকে প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত নারীদের কর্মসংস্থানের হার, তাঁদের ক্যারিয়ারের উর্ধ্বমুখী অগ্রগতি এবং উচ্চ-উৎপাদনশীল খাতগুলোতে তাঁদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ। শিক্ষা নারীদের জন্য যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে তার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। অর্জিত শিক্ষা যখন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপ নেবে, তখনই বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গল্পটি পূর্ণতা পাবে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো