মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

কিশোর গ্যাং ও মাদকের মরণফাঁদ

কিশোর গ্যাং ও মাদকের মরণফাঁদ: আমরা কি তবে একটি অনুভূতিহীন প্রজন্ম গড়ছি?

কিশোর গ্যাং ও মাদকের মরণফাঁদ: আমরা কি তবে একটি অনুভূতিহীন প্রজন্ম গড়ছি?

আমাদের চারপাশের চেনা সমাজটা যেন এক নীরব অথচ দ্রুতগতির অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে কিশোরদের কোলাহলে মুখরিত থাকার কথা ছিল স্কুল প্রাঙ্গণ কিংবা খেলার মাঠ, তাদের একটি বড় অংশ আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে, হাতে তাদের বইয়ের বদলে ধারালো অস্ত্র, আর মগজে মাদকের বিষাক্ত নেশা।

কিশোর গ্যাং নামক যে দানবটি গত কয়েক বছর ধরে আমাদের শহুরে ও গ্রামীণ জীবনে জেঁকে বসেছে, তার পেছনের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে মাদক। এটি কেবল একজন তরুণের ব্যক্তিগত জীবনকে ধ্বংস করছে না, বরং আমাদের গোটা সামাজিক ও নৈতিক ভিত্তিটাকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। একটি সুস্থ সমাজ কখনোই রাতারাতি এমন অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে না। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা কিংবা বাড্ডার মতো জনাকীর্ণ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের যে নৃশংসতা ও অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া আমরা দেখছি, তা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

  • অপরাধের বিস্তৃতি : খুন, ছিনতাই, ইভটিজিং থেকে শুরু করে ভাড়ায় খাটুনি—হেন কোনো অপরাধ নেই যেখানে এই কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে না।
  • নেপথ্যের গডফাদার : সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই কাঁচা বয়সের কিশোরদের অবলীলায় দাবার ঘুঁটি বানাচ্ছে সমাজেরই এক শ্রেণীর তথাকথিত বড় ভাই ও প্রভাবশালী মহল। কিশোরেরা এখানে কেবল অপরাধী নয়, তারা একটি সুসংগঠিত এবং লাভজনক অপরাধ অর্থনীতির সস্তা ও সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে।


মাদক ও গ্যাং সংস্কৃতির সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিটি কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিনিয়ত মাদক সেবনের ফলে এই কিশোরদের মন থেকে মানবিক সহানুভূতি, মায়া ও আবেগ পুরোপুরি লোপ পাচ্ছে। চরম নৃশংসতাও তাদের কাছে হয়ে উঠছে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়।

আমরা কি তবে এমন এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হবে সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন, হিংস্র ও আত্মকেন্দ্রিক? যে বয়সে তাদের মনে প্রেম, স্বপ্ন আর দেশপ্রেম থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের বুদ হয়ে থাকতে হচ্ছে জিঘাংসা আর সস্তা উন্মাদনায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়শই অভিযান চালাচ্ছে, গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে কিংবা মাদকের চালান জব্দ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত তৎপরতার পরও কেন এই ক্ষত শুকোচ্ছে না? কারণ খুব স্পষ্ট—আমরা বারবার রোগের লক্ষণ দেখে ওষুধ দিচ্ছি, কিন্তু রোগের মূল উৎসটাকে স্পর্শই করছি না।

  • সীমান্তে শিথিলতা : সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবিরাম প্রবেশ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
  • রাজনৈতিক আশ্রয় : অপরাধীদের পেছনে থাকা স্থানীয় রাজনৈতিক গডফাদারদের উৎসগুলো এখনো অক্ষত।
  • কালো টাকার খেলা : মাদকের বিপুল অঙ্কের কালো টাকা যেখানে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার প্রলোভন দেখায়, সেখানে কিশোরদের কেবল উপদেশ দিয়ে ভালো পথে রাখা অসম্ভব।


আমাদের করণীয় কী?

কিশোর গ্যাংয়ের এই ভয়াবহ বিস্তার আসলে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ব্যর্থতারই একটি নির্মম আয়না। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে এখনই বহুমাত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে :

  • পারিবারিক নজরদারি : প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল ও মনোযোগী হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, সেই খোঁজ রাখা জরুরি।
  • মূল্যবোধের শিক্ষা : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা না বানিয়ে মানবিক মূল্যবোধের পাঠশালা করে তুলতে হবে।
  • সুস্থ বিনোদন : প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে।
  • জিরো টলারেন্স : অপরাধী যে দলেরই হোক, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি এই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলব, নাকি এখনই সর্বশক্তি দিয়ে এই মরণফাঁদ ভেঙে আমাদের সন্তানদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনব? রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক জাগরণ ছাড়া এই লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্র ও সমাজকে জেগে উঠতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


কিশোর গ্যাং ও মাদকের মরণফাঁদ: আমরা কি তবে একটি অনুভূতিহীন প্রজন্ম গড়ছি?

প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬

featured Image

আমাদের চারপাশের চেনা সমাজটা যেন এক নীরব অথচ দ্রুতগতির অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে কিশোরদের কোলাহলে মুখরিত থাকার কথা ছিল স্কুল প্রাঙ্গণ কিংবা খেলার মাঠ, তাদের একটি বড় অংশ আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে, হাতে তাদের বইয়ের বদলে ধারালো অস্ত্র, আর মগজে মাদকের বিষাক্ত নেশা।

কিশোর গ্যাং নামক যে দানবটি গত কয়েক বছর ধরে আমাদের শহুরে ও গ্রামীণ জীবনে জেঁকে বসেছে, তার পেছনের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে মাদক। এটি কেবল একজন তরুণের ব্যক্তিগত জীবনকে ধ্বংস করছে না, বরং আমাদের গোটা সামাজিক ও নৈতিক ভিত্তিটাকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। একটি সুস্থ সমাজ কখনোই রাতারাতি এমন অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে না। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা কিংবা বাড্ডার মতো জনাকীর্ণ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের যে নৃশংসতা ও অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া আমরা দেখছি, তা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

  • অপরাধের বিস্তৃতি : খুন, ছিনতাই, ইভটিজিং থেকে শুরু করে ভাড়ায় খাটুনি—হেন কোনো অপরাধ নেই যেখানে এই কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে না।
  • নেপথ্যের গডফাদার : সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই কাঁচা বয়সের কিশোরদের অবলীলায় দাবার ঘুঁটি বানাচ্ছে সমাজেরই এক শ্রেণীর তথাকথিত বড় ভাই ও প্রভাবশালী মহল। কিশোরেরা এখানে কেবল অপরাধী নয়, তারা একটি সুসংগঠিত এবং লাভজনক অপরাধ অর্থনীতির সস্তা ও সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে।


মাদক ও গ্যাং সংস্কৃতির সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিটি কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিনিয়ত মাদক সেবনের ফলে এই কিশোরদের মন থেকে মানবিক সহানুভূতি, মায়া ও আবেগ পুরোপুরি লোপ পাচ্ছে। চরম নৃশংসতাও তাদের কাছে হয়ে উঠছে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়।

আমরা কি তবে এমন এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হবে সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন, হিংস্র ও আত্মকেন্দ্রিক? যে বয়সে তাদের মনে প্রেম, স্বপ্ন আর দেশপ্রেম থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের বুদ হয়ে থাকতে হচ্ছে জিঘাংসা আর সস্তা উন্মাদনায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়শই অভিযান চালাচ্ছে, গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে কিংবা মাদকের চালান জব্দ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত তৎপরতার পরও কেন এই ক্ষত শুকোচ্ছে না? কারণ খুব স্পষ্ট—আমরা বারবার রোগের লক্ষণ দেখে ওষুধ দিচ্ছি, কিন্তু রোগের মূল উৎসটাকে স্পর্শই করছি না।

  • সীমান্তে শিথিলতা : সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবিরাম প্রবেশ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
  • রাজনৈতিক আশ্রয় : অপরাধীদের পেছনে থাকা স্থানীয় রাজনৈতিক গডফাদারদের উৎসগুলো এখনো অক্ষত।
  • কালো টাকার খেলা : মাদকের বিপুল অঙ্কের কালো টাকা যেখানে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার প্রলোভন দেখায়, সেখানে কিশোরদের কেবল উপদেশ দিয়ে ভালো পথে রাখা অসম্ভব।


আমাদের করণীয় কী?

কিশোর গ্যাংয়ের এই ভয়াবহ বিস্তার আসলে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ব্যর্থতারই একটি নির্মম আয়না। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে এখনই বহুমাত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে :

  • পারিবারিক নজরদারি : প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল ও মনোযোগী হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, সেই খোঁজ রাখা জরুরি।
  • মূল্যবোধের শিক্ষা : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা না বানিয়ে মানবিক মূল্যবোধের পাঠশালা করে তুলতে হবে।
  • সুস্থ বিনোদন : প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে।
  • জিরো টলারেন্স : অপরাধী যে দলেরই হোক, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি এই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলব, নাকি এখনই সর্বশক্তি দিয়ে এই মরণফাঁদ ভেঙে আমাদের সন্তানদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনব? রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক জাগরণ ছাড়া এই লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্র ও সমাজকে জেগে উঠতে হবে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো