মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সম্পাদকীয়

বাজেট কি কেবলই বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি সাধারণ মানুষের জীবন বদলানোর হাতিয়ার?

বাজেট কি কেবলই বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি সাধারণ মানুষের জীবন বদলানোর হাতিয়ার?

জাতীয় বাজেটকে ঘিরে প্রতিবছরই আমাদের দেশে ব্যাপক আলোচনা, প্রত্যাশা আর বিতর্কের ঝড় ওঠে। কিন্তু অদ্ভুত এক নিয়মে বাজেট পাস হওয়ার কিছুদিন পর সেই আলোচনা আবার স্তিমিত হয়ে যায়। তখন দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বাজেট কি শুধু একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি সত্যিই অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার কোনো কার্যকর হাতিয়ার?

আমরা সাধারণত বাজেটকে আয়-ব্যয়ের হিসাবের একটা শুষ্ক দলিল হিসেবে দেখে অভ্যস্ত। অথচ একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট নীতিপত্র। কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কোথায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা পাবে এবং বিনিয়োগের বাধা কীভাবে দূর হবে, তার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবায়নের কার্যকর কাঠামোর অভাবে বাজেট অনেক সময় পরিবর্তনের রূপরেখা না হয়ে স্রেফ কিছু আশ্বাসের সরকারি নথিতে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

আমার দৃষ্টিতে, বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—ফলাফল নিয়ে কোনো জবাবদিহি না থাকা। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা বরাদ্দ পেল সেটা আমরা ঘটা করে জানতে পারি, কিন্তু সেই টাকায় বাস্তবে কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু পুষ্টি পেল, কিংবা কতজন রোগী সঠিক চিকিৎসা পেল, সেই হিসাব প্রায় কখনো জনসমক্ষে আসে না। এই ফলাফলভিত্তিক কাঠামো না থাকলে বরাদ্দ যতই বাড়ানো হোক, অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় না। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) একটি বড় অংশ বছর শেষে অব্যয়িত থাকে, নয়তো জুনের শেষ সপ্তাহে তাড়াহুড়ো করে দায়সারাভাবে খরচ দেখানো হয়। এই ‘নয়ছয়’ করার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে বাজেটের আকার ট্রিলিয়ন টাকা বাড়ালেও কোনো লাভ নেই।

একইভাবে, আমাদের রাজস্ব সংকট নিয়ে এখন খোলামেলা আলোচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বহু বছর ধরেই ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় অর্ধেক। এত সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো আর সামাজিক নিরাপত্তা একসঙ্গে সামাল দেওয়া অসম্ভব। তবে কর বাড়ানো মানেই সাধারণ মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো নয়। আমাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত কর ফাঁকি কমানো, ঢালাও কর অব্যাহতির সুবিধাগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং সমাজের প্রকৃত সম্পদশালীদের কার্যকরভাবে করের আওতায় আনা।

আমাদের জ্বালানি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা এখনো আমদানিনির্ভরতার এক বৃত্তে আটকে আছি। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়ে, ভর্তুকির চাপ বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। অথচ আমাদের দেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। রুফটপ সোলার বা শিল্পাঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাজেটে এখনো সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ নেই। আমি মনে করি, সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অবিলম্বে একটি স্পষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি করা দরকার।

অন্যদিকে, আমাদের ব্যাংক খাতের সংকট এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। অফিশিয়াল হিসাবেই খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যদিও প্রকৃত চিত্র আরও অনেক বেশি উদ্বেগজনক। বারবার পুনঃ তফসিলের সুযোগ দিয়ে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হলেও সৎ উদ্যোক্তারা দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই একটি স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কোনো অসৎ ঋণগ্রহীতা বা দুর্বল মালিকগোষ্ঠীকে নয়।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট তো আরও প্রকট। অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও মৌলিক ভাষা ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। আমি নিজে বিভিন্ন মফস্বল ও জেলা পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার গ্রাউন্ড রিয়েলিটি কতটা করুণ! বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট পড়ে আছে, ওষুধের সরবরাহ অনিয়মিত। ফলে একজন রোগীকে সামান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হয়, আর সেই যাওয়া-আসার খরচে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার এক ধাক্কায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখনো ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে আসে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।


অনেকে প্রশ্ন করেন, কর্মসংস্থানের সমস্যা কি বাজেট দিয়ে সমাধান সম্ভব? পুরোপুরি না হলেও, একটা বড় অংশ কিন্তু সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে এত বড় শ্রমশক্তি সামলানো যাবে না। আমাদের অ্যাগ্রো প্রসেসিং, আইটি-সেবা, ফার্মা ও লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ টানতে হবে। প্রয়োজনে বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক বিশেষ প্রণোদনা বা কর ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামো নয়, বরং আমাদের নীতির অনিশ্চয়তা। ঘন ঘন কর নীতির পরিবর্তন আর দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক অনুমোদনপ্রক্রিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে নামসর্বস্ব না রেখে কাস্টমস, পরিবেশ ছাড়পত্র ও কোম্পানি নিবন্ধন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

আসন্ন বাজেটটি হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। তাই এখানে কেবল সংখ্যার কাগুজে পরিমাণ বাড়ালেই চলবে না, প্রয়োজন একটি স্পষ্ট ও শক্ত নীতিগত বার্তা। আর সেই বার্তাটি হওয়া উচিত—এবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে ফলাফলের ভিত্তিতে। কোন খাতে কত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো, তার চেয়ে সেই অর্থে সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তবে কী পরিবর্তন এল, সেটাই দেশবাসী দেখতে চায়। মানুষ আসলে বড় আকারের কাল্পনিক বাজেট দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় বাজেটের টাকায় তাদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় স্বস্তি এসেছে কি না। সেই দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল বাজেটের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে।

বিষয় : মতামত সরকার বাজেট বাজেট ২০২৬-২৭

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


বাজেট কি কেবলই বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি সাধারণ মানুষের জীবন বদলানোর হাতিয়ার?

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

জাতীয় বাজেটকে ঘিরে প্রতিবছরই আমাদের দেশে ব্যাপক আলোচনা, প্রত্যাশা আর বিতর্কের ঝড় ওঠে। কিন্তু অদ্ভুত এক নিয়মে বাজেট পাস হওয়ার কিছুদিন পর সেই আলোচনা আবার স্তিমিত হয়ে যায়। তখন দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বাজেট কি শুধু একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি সত্যিই অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার কোনো কার্যকর হাতিয়ার?

আমরা সাধারণত বাজেটকে আয়-ব্যয়ের হিসাবের একটা শুষ্ক দলিল হিসেবে দেখে অভ্যস্ত। অথচ একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট নীতিপত্র। কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কোথায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা পাবে এবং বিনিয়োগের বাধা কীভাবে দূর হবে, তার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবায়নের কার্যকর কাঠামোর অভাবে বাজেট অনেক সময় পরিবর্তনের রূপরেখা না হয়ে স্রেফ কিছু আশ্বাসের সরকারি নথিতে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

আমার দৃষ্টিতে, বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—ফলাফল নিয়ে কোনো জবাবদিহি না থাকা। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা বরাদ্দ পেল সেটা আমরা ঘটা করে জানতে পারি, কিন্তু সেই টাকায় বাস্তবে কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু পুষ্টি পেল, কিংবা কতজন রোগী সঠিক চিকিৎসা পেল, সেই হিসাব প্রায় কখনো জনসমক্ষে আসে না। এই ফলাফলভিত্তিক কাঠামো না থাকলে বরাদ্দ যতই বাড়ানো হোক, অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় না। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) একটি বড় অংশ বছর শেষে অব্যয়িত থাকে, নয়তো জুনের শেষ সপ্তাহে তাড়াহুড়ো করে দায়সারাভাবে খরচ দেখানো হয়। এই ‘নয়ছয়’ করার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে বাজেটের আকার ট্রিলিয়ন টাকা বাড়ালেও কোনো লাভ নেই।

একইভাবে, আমাদের রাজস্ব সংকট নিয়ে এখন খোলামেলা আলোচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বহু বছর ধরেই ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় অর্ধেক। এত সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো আর সামাজিক নিরাপত্তা একসঙ্গে সামাল দেওয়া অসম্ভব। তবে কর বাড়ানো মানেই সাধারণ মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো নয়। আমাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত কর ফাঁকি কমানো, ঢালাও কর অব্যাহতির সুবিধাগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং সমাজের প্রকৃত সম্পদশালীদের কার্যকরভাবে করের আওতায় আনা।

আমাদের জ্বালানি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা এখনো আমদানিনির্ভরতার এক বৃত্তে আটকে আছি। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়ে, ভর্তুকির চাপ বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। অথচ আমাদের দেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। রুফটপ সোলার বা শিল্পাঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাজেটে এখনো সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ নেই। আমি মনে করি, সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অবিলম্বে একটি স্পষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি করা দরকার।

অন্যদিকে, আমাদের ব্যাংক খাতের সংকট এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। অফিশিয়াল হিসাবেই খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যদিও প্রকৃত চিত্র আরও অনেক বেশি উদ্বেগজনক। বারবার পুনঃ তফসিলের সুযোগ দিয়ে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হলেও সৎ উদ্যোক্তারা দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই একটি স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কোনো অসৎ ঋণগ্রহীতা বা দুর্বল মালিকগোষ্ঠীকে নয়।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট তো আরও প্রকট। অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও মৌলিক ভাষা ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। আমি নিজে বিভিন্ন মফস্বল ও জেলা পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার গ্রাউন্ড রিয়েলিটি কতটা করুণ! বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট পড়ে আছে, ওষুধের সরবরাহ অনিয়মিত। ফলে একজন রোগীকে সামান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হয়, আর সেই যাওয়া-আসার খরচে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার এক ধাক্কায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখনো ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে আসে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।


অনেকে প্রশ্ন করেন, কর্মসংস্থানের সমস্যা কি বাজেট দিয়ে সমাধান সম্ভব? পুরোপুরি না হলেও, একটা বড় অংশ কিন্তু সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে এত বড় শ্রমশক্তি সামলানো যাবে না। আমাদের অ্যাগ্রো প্রসেসিং, আইটি-সেবা, ফার্মা ও লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ টানতে হবে। প্রয়োজনে বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক বিশেষ প্রণোদনা বা কর ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামো নয়, বরং আমাদের নীতির অনিশ্চয়তা। ঘন ঘন কর নীতির পরিবর্তন আর দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক অনুমোদনপ্রক্রিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে নামসর্বস্ব না রেখে কাস্টমস, পরিবেশ ছাড়পত্র ও কোম্পানি নিবন্ধন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

আসন্ন বাজেটটি হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। তাই এখানে কেবল সংখ্যার কাগুজে পরিমাণ বাড়ালেই চলবে না, প্রয়োজন একটি স্পষ্ট ও শক্ত নীতিগত বার্তা। আর সেই বার্তাটি হওয়া উচিত—এবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে ফলাফলের ভিত্তিতে। কোন খাতে কত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো, তার চেয়ে সেই অর্থে সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তবে কী পরিবর্তন এল, সেটাই দেশবাসী দেখতে চায়। মানুষ আসলে বড় আকারের কাল্পনিক বাজেট দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় বাজেটের টাকায় তাদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় স্বস্তি এসেছে কি না। সেই দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল বাজেটের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো