মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

প্রান্তিক মানুষের হাহাকার ও সংকটের টেকসই সমাধান

আমাদের সমাজের এমন এক বৃহৎ অংশ রয়েছে, যারা বছরের পর বছর নীরব থেকে অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখে। যাদের ঘামে ধান ফলে, কারখানার চাকা ঘোরে এবং সাধারণ মানুষের অন্ন সংস্থান হয়—সেই কৃষক, খেতমজুর ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবীরাই আজ দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে ব্যাকফুটে। শহর বা রাজধানীর আলোচনায় তাঁদের এই জীবনসংগ্রামের খবর পৌঁছায় খুব সামান্যই।দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকের জমি এখন দুই থেকে ১০ বিঘার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই জমিতে অন্তত দুটি ফসল ফলিয়েই কৃষককে তাঁর সংসারের খাওয়া-পরা, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি অর্থনীতিতে একটি মৌসুমের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানেই কৃষক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া। পরপর দুই মৌসুম লোকসান হলে ভিটেমাটি বিক্রি ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ থাকে না। বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলে সার সংকটের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে—তা অত্যন্ত উদ্বেগের। সারের মজুত থাকার পরও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে কৃষকদের দিশেহারা হয়ে গুদাম ভাঙার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে যেসব বামপন্থী বা রাজনৈতিক সংগঠন কৃষকদের দাবি নিয়ে মাঠ সোচ্চার রাখত, তাঁদের ভূমিকাও এখন স্তিমিত।কৃষির বাইরে হতদরিদ্র খেতমজুর শ্রেণির শ্রমজীবীরা বছরে মাত্র তিন-চার মাস কাজ পান। বাকি সময় কর্মহীন কাটানো এই মানুষদের জন্য সরকারি 'কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি' (কাবিখা) অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে। অতিরিক্ত ওভারটাইম বন্ধ হওয়া এবং ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ না থাকায় নিঃশব্দে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। মালিকপক্ষও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি ও ক্রেতা হারানোর আশঙ্কায় ঋণখেলাপি হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।শহর ও মফস্বলের ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র আইসক্রিম, বেকারি বা বরফ কলের মতো বিদ্যুৎনির্ভর প্রতিষ্ঠানের মালিকরা এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছেন।বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে এখনই বাস্তবমুখী ও মানবিক কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ: বর্ষা মৌসুম কেটে যাওয়ার পরপরই ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও এলজিআরডির মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে কাবিখা ও ক্ষুদ্র অবকাঠামো প্রকল্প জোরদার করতে হবে।ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শিল্পে সহায়তা: যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে এখনই ঋণখেলাপি না করে সহজ শর্তে কিস্তি পরিশোধের সুযোগ ও বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার: সিএনজি স্টেশনগুলোতে গণপরিবহন ও সিএনজি চালকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের জন্য আলাদা লাইন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেট কার ব্যবহারকারীদের আপৎকালীন সময়ে পেট্রল বা অকটেন ব্যবহারে উৎসাহিত করা জরুরি।[TECHTARANGA-POST:1259]যেকোনো সংকটের টেকসই মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হলো যোগ্য নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। সরকারের উচিত দেশের প্রকৃত চিত্র ও সম্পদের ঘাটতি সম্পর্কে জনগণকে খোলামেলা জানানো। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝিয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানালে এ দেশের সাধারণ মানুষ সর্বদা ইতিবাচক সাড়া দেয়। প্রান্তিক মানুষের পিঠ যেন আর দেয়ালে না ঠেকে—সেদিকেই এখন নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

প্রান্তিক মানুষের হাহাকার ও সংকটের টেকসই সমাধান