মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সম্পাদকীয়

আশুরার মূল শিক্ষা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন

আশুরার মূল শিক্ষা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন

আরবি আশারা শব্দ থেকে আশুরা শব্দটির উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ দশম। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখে এই বিশেষ দিনটি মুসলিম উম্মাহসহ গোটা বিশ্বে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়। ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তো বটেই, এমনকি ইসলামপূর্ব যুগেও মক্কার পৌত্তলিক এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি মহিমান্বিত দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সৃষ্টির সূচনাপর্ব থেকেই ১০ মহররম নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইতিহাস অনুযায়ী, এই দিনে আসমান, জমিন, সাগর ও পাহাড় সৃজিত হয়েছিল, আদি পিতা আদম (আ.) ও বিবি হাওয়ার তওবা কবুল হয়েছিল; মহাপ্লাবনের পর নুহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে নোঙর করেছিল এবং ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের তওবা কবুল হয়েছিল। এর চেয়েও বড় ঐতিহাসিক সত্য হলো, এই ১০ মহররম আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে অলৌকিকভাবে মুক্ত করেছিলেন এবং লোহিত সাগরে ফেরাউনের সলিলসমাধি ঘটেছিল।

তবে সমকালীন বিশ্বে আশুরার দিনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও আবেগঘন হয়ে উঠেছে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্নেহের দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের কারণে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের প্রায় অর্ধশতক পর হিজরি ৬১ সনের এই দিনে কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া নির্মম ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির কারণে দিনটি মুসলিম হৃদয়ে গভীর শোক ও বেদনার চিরন্তন প্রতীক। ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা জানি, মুআবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ দামেস্কের খলিফা হিসেবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু ইয়াজিদ এই পদের অযোগ্য, বিলাসপ্রিয় ও অত্যাচারী হওয়ায় মদিনার শীর্ষস্থানীয় সাহাবিরা তাঁর আনুগত্য (বায়াত) মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান, যাঁদের অন্যতম ছিলেন মা ফাতিমা (রা.)-এর আদরের দুলাল হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।

এই পরিস্থিতিতে কুফাবাসীরা ইয়াজিদের হাত থেকে মুক্তি পেতে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফায় আসার জন্য হাজার হাজার চিঠি পাঠায় এবং তাঁকে খলিফা হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু স্বার্থান্বেষী কুফাবাসী পরবর্তীতে তাদের দেওয়া সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। ইমাম হোসাইন (রা.) ইরাকের কারবালা নামক প্রান্তরে পৌঁছালে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বিশাল বাহিনী চারদিক থেকে তাঁর পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফোরাত নদীর তীরে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যার ধমনিতে বইছে মহানবীর পবিত্র রক্ত, তিনি কোনোদিন মিথ্যার কাছে মাথা নত করতে পারেন না। তিনি জালিমের বশ্যতা অস্বীকার করেন। ফলশ্রুতিতে, ফোরাতের তীরে অবরুদ্ধ ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মাত্র ৭২ জন সঙ্গীসহ নির্মমভাবে শহীদ হন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।

কারবালার এই রক্তক্ষয়ী প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন লড়াইয়ের এক জাজ্বল্যমান স্মারক। কারবালা আমাদের শেখায়—প্রয়োজনে প্রাণোৎসর্গ করতে হবে, তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ, সহনশীলতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে আমৃত্যু অবিচল থাকা।

আজকের এই পবিত্র প্রহরে আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আশুরার চেতনাকে ধারণ করা জরুরি। আসুন, অতীতের গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার পাশাপাশি আমরা কারবালার অবিনাশী চেতনায় দীক্ষিত হই। বর্তমান সমাজে চলমান সব ধরনের জুলুম, অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আওয়াজ তোলাই হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি দূর করে আগামীর পৃথিবীকে নিষ্কলুষ, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক করে তোলাই হোক এই আশুরায় আমাদের সুদৃঢ় শপথ।

বিষয় : সম্পাদকীয় মতামত

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


আশুরার মূল শিক্ষা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

আরবি আশারা শব্দ থেকে আশুরা শব্দটির উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ দশম। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখে এই বিশেষ দিনটি মুসলিম উম্মাহসহ গোটা বিশ্বে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়। ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তো বটেই, এমনকি ইসলামপূর্ব যুগেও মক্কার পৌত্তলিক এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি মহিমান্বিত দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সৃষ্টির সূচনাপর্ব থেকেই ১০ মহররম নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইতিহাস অনুযায়ী, এই দিনে আসমান, জমিন, সাগর ও পাহাড় সৃজিত হয়েছিল, আদি পিতা আদম (আ.) ও বিবি হাওয়ার তওবা কবুল হয়েছিল; মহাপ্লাবনের পর নুহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে নোঙর করেছিল এবং ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের তওবা কবুল হয়েছিল। এর চেয়েও বড় ঐতিহাসিক সত্য হলো, এই ১০ মহররম আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে অলৌকিকভাবে মুক্ত করেছিলেন এবং লোহিত সাগরে ফেরাউনের সলিলসমাধি ঘটেছিল।

তবে সমকালীন বিশ্বে আশুরার দিনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও আবেগঘন হয়ে উঠেছে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্নেহের দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের কারণে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের প্রায় অর্ধশতক পর হিজরি ৬১ সনের এই দিনে কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া নির্মম ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির কারণে দিনটি মুসলিম হৃদয়ে গভীর শোক ও বেদনার চিরন্তন প্রতীক। ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা জানি, মুআবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ দামেস্কের খলিফা হিসেবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু ইয়াজিদ এই পদের অযোগ্য, বিলাসপ্রিয় ও অত্যাচারী হওয়ায় মদিনার শীর্ষস্থানীয় সাহাবিরা তাঁর আনুগত্য (বায়াত) মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান, যাঁদের অন্যতম ছিলেন মা ফাতিমা (রা.)-এর আদরের দুলাল হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।

এই পরিস্থিতিতে কুফাবাসীরা ইয়াজিদের হাত থেকে মুক্তি পেতে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফায় আসার জন্য হাজার হাজার চিঠি পাঠায় এবং তাঁকে খলিফা হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু স্বার্থান্বেষী কুফাবাসী পরবর্তীতে তাদের দেওয়া সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। ইমাম হোসাইন (রা.) ইরাকের কারবালা নামক প্রান্তরে পৌঁছালে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বিশাল বাহিনী চারদিক থেকে তাঁর পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফোরাত নদীর তীরে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যার ধমনিতে বইছে মহানবীর পবিত্র রক্ত, তিনি কোনোদিন মিথ্যার কাছে মাথা নত করতে পারেন না। তিনি জালিমের বশ্যতা অস্বীকার করেন। ফলশ্রুতিতে, ফোরাতের তীরে অবরুদ্ধ ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মাত্র ৭২ জন সঙ্গীসহ নির্মমভাবে শহীদ হন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।

কারবালার এই রক্তক্ষয়ী প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন লড়াইয়ের এক জাজ্বল্যমান স্মারক। কারবালা আমাদের শেখায়—প্রয়োজনে প্রাণোৎসর্গ করতে হবে, তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ, সহনশীলতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে আমৃত্যু অবিচল থাকা।

আজকের এই পবিত্র প্রহরে আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আশুরার চেতনাকে ধারণ করা জরুরি। আসুন, অতীতের গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার পাশাপাশি আমরা কারবালার অবিনাশী চেতনায় দীক্ষিত হই। বর্তমান সমাজে চলমান সব ধরনের জুলুম, অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আওয়াজ তোলাই হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি দূর করে আগামীর পৃথিবীকে নিষ্কলুষ, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক করে তোলাই হোক এই আশুরায় আমাদের সুদৃঢ় শপথ।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো