মানুষ আজকাল নানা অজুহাতে নিজেদের মধ্যে দেয়াল তুলে দেয়। সম্পর্কের মাঝখানে তৈরি করে বিভাজন, আর সেই বিভাজনকেই একসময় নিজেদের গৌরব বলে মনে করে। অথচ বিভক্ত হওয়া মানে নিজের পৃথিবীটাকে আরও ছোট করে ফেলা, নিজের অস্তিত্বকে সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে রাখা। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বৃহত্তর হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার পরিবর্তে কখনো কখনো ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়াকেই সুখ বলে মেনে নেয়।
শায়লা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— জানো, সব বিচ্ছেদ মানুষের ইচ্ছায় হয় না। কখনো জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, কখনো পরিস্থিতি, আবার কখনো প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়ম মানুষকে ধীরে ধীরে ছোট করে দেয়। একটা সময় আসে, যখন মানুষ নিজের ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিতে দিতে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, যেখানে তার আর কিছু হারানোরও থাকে না।
কথাগুলো শুনে রহিম উদ্দিন চুপ করে রইলেন।
পৌষের শীত। রাত তখন গভীর হওয়ার পথে। কনকনে ঠান্ডা বাতাসে কাঁপছে গ্রামের পুরোনো বাড়ির উঠান। উঠানের এক পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি নারকেল আর সুপারি গাছ। গাছের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ঝরে যাওয়া ফুল। একসময় যে ফুলগুলো গাছের সৌন্দর্য বাড়িয়েছিল, আজ সেগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অপেক্ষায়।
রহিম উদ্দিন সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— আমিও এখন ঠিক ওই ঝরে পড়া ফুলগুলোর মতো। একসময় এই বাড়িতে আমারও একটা মূল্য ছিল। আমার কথায় সবাই বসত, আমার সিদ্ধান্তে সংসারের কাজ চলত। আর আজ মনে হয়, আমি যেন এই বাড়ির একটা অপ্রয়োজনীয় মানুষ। জীবনও একদিন ওই ফুলগুলোর মতো টুপ করে ঝরে পড়বে। কেউ হয়তো খেয়ালও করবে না।
শায়লা বেগম স্বামীর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে অভিমান, মুখে চাপা কষ্ট।
— তুমি এমন কথা বলছ কেন? তুমি কি জানো না, তোমার কষ্ট আমারও কষ্ট?
রহিম উদ্দিন হেসে বললেন,
— জানি। কিন্তু সব কষ্ট কি কাউকে বোঝানো যায়, শায়লা?
আকাশে তখন আধখানা চাঁদ। চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই, সূর্যের কাছ থেকে ধার করা আলো দিয়েই সে পৃথিবীকে রূপালি করে তোলে। অথচ সেই ধার করা আলোতেও কত মায়া, কত সৌন্দর্য! রাতের আকাশে ছড়িয়ে থাকা তারাগুলো যেন নীরবে লিখে চলেছে কোনো অজানা কবির না-বলা কবিতা।
রহিম উদ্দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— দেখো শায়লা, চাঁদটা আজ কী সুন্দর! মনে হয়, কেউ যেন সারা আকাশজুড়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছে।
তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি মেশানো কণ্ঠে বললেন,
— জানো, পূর্ণিমার চাঁদও ঠিক তোমার মতো।
শায়লা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন।
— আমার মতো মানে?
— মানে, চাঁদ রাতকে সুন্দর করে, আর তুমি আমার জীবনটাকে। চাঁদের জ্যোৎস্না পৃথিবীকে আলোকিত করে, আর তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার অন্ধকার মনটাও আলো খুঁজে পায়। তোমার সৌন্দর্যের কাছে আকাশের সব তারাও হার মানবে।
কথা শেষ করে রহিম উদ্দিন এমনভাবে হেসে উঠলেন, যেন এই শীতের রাতে তাঁর মনে কোনো দুঃখই নেই।
শায়লা বেগম মুখে বিরক্তি দেখিয়ে বললেন,
— বুড়ো বয়সে তোমার এসব কথা শুনলে কে বিশ্বাস করবে?
রহিম উদ্দিন আবার হাসলেন।
— ভালোবাসার কি কোনো বয়স আছে? মানুষ বুড়ো হয়, শরীর বুড়ো হয়, কিন্তু মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা ভালোবাসাগুলো বুড়ো হয় না।
শায়লা বেগম আর কিছু বললেন না। শুধু মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে যে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছিল, তা রহিম উদ্দিনের চোখ এড়াল না।
চারদিকে তখন গভীর নীরবতা। দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কুকুরের ডাক। বাঁশঝাড়ের পাতায় পাতায় শীতের বাতাসের মৃদু শব্দ। প্রকৃতির এই শান্ত রূপ মনকে প্রশান্ত করার কথা, অথচ রহিম উদ্দিনের ভেতরটা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে।
কারণ, আজকের রাতটা অন্য রাতের মতো নয়।
আজ এই বাড়িতে তাঁদের একসঙ্গে যৌথ পরিবার হিসেবে থাকার শেষ রাত।
আগামীকাল থেকে তাঁরা আলাদা হয়ে যাবেন। একই উঠান থাকবে, একই বাড়ির আকাশ থাকবে, হয়তো নারকেল গাছগুলোর ছায়াও আগের মতোই পড়বে—কিন্তু মানুষগুলো আর আগের মতো একসঙ্গে থাকবে না।
সংসারের হিসাব-নিকাশ, জমিজমা, ঘরবাড়ি আর ছোটখাটো মনোমালিন্য ধীরে ধীরে এমন এক দেয়াল তৈরি করেছে, যার ওপাশে এখন আপন মানুষগুলোও পর হয়ে যাচ্ছে।
রহিম উদ্দিন জানেন, বয়সের এই প্রান্তে এসে নতুন করে সংসার গুছিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যে উঠানে সন্তানদের বড় হতে দেখেছেন, যে ঘরে পরিবারের সবার হাসি-কান্না ভাগ করে নিয়েছেন, সেই উঠান ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবতেই তাঁর বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে।
তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— শায়লা, একটা কথা বলব?
— বলো।
— কাল থেকে আমরা আলাদা হয়ে যাব। কিন্তু বলো তো, আলাদা হলেই কি মানুষ সত্যিই আলাদা হয়ে যায়? একই মায়ের পেটের ভাইয়েরা আলাদা ঘরে থাকবে, একই উঠানে আর একসঙ্গে বসে খাওয়া হবে না—এই কি জীবনের শেষ কথা?
শায়লা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— ঘর আলাদা হলে মানুষ আলাদা হয় না, রহিম। মানুষ আলাদা হয় তখন, যখন একে অপরের কষ্ট বোঝার ইচ্ছেটুকু হারিয়ে ফেলে। একই ছাদের নিচে থেকেও অনেকে পর হয়ে যায়, আবার দূরে থেকেও কেউ কেউ আপন থাকে।
রহিম উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— কথাটা ঠিক। কিন্তু এত বছরের সংসারটা এভাবে ভেঙে যেতে দেখলে কষ্ট হয়। এই উঠানের প্রতিটি কোণে আমাদের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। কোথায় যেন ছোট ছেলেটা প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, কোথায় বড় ছেলেটার বিয়ের পর সবাই মিলে বসেছিলাম, কোন ঘরে বসে মেয়ের বিদায়ের দিন কেঁদেছিলে—সব মনে পড়ছে। কাল থেকে হয়তো সব থাকবে, শুধু আগের মতো করে আমরা থাকব না।
শায়লা বেগম এবার স্বামীর পাশে এসে বসলেন। তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— কিছু সম্পর্ক দূরত্বে ভাঙে না, রহিম। ভাঙে অবহেলায়। আমরা শুধু চেষ্টা করব, যেন আমাদের হৃদয়ের দরজাটা বন্ধ না হয়ে যায়।
রহিম উদ্দিন স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
চাঁদের আলো তখন উঠানের মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ঝরে যাওয়া ফুলগুলোর ওপর সেই আলো পড়ে তাদেরও যেন এক ধরনের সৌন্দর্য দিয়েছে। রহিম উদ্দিনের মনে হলো, মানুষের জীবনও বোধ হয় এমনই। কিছু মানুষ ঝরে যায়, কিছু সম্পর্ক মাটিতে মিশে যায়, তবু তাদের স্মৃতি কোনো এক নীরব রাতে ফিরে এসে বুকের ভেতর কাঁপন তোলে।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
— আব্বা, তোমরা এখনো উঠানে বসে আছ কেন? কাল সকালে তো অনেক কাজ!
রহিম উদ্দিন চমকে উঠলেন। বড় ছেলে সাইফুল দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— আসছি বাবা, আর একটু বসি।
সাইফুল কিছু না বলে ঘরের ভেতরে চলে গেল।
রহিম উদ্দিন আবার আকাশের দিকে তাকালেন। মনে মনে ভাবলেন, মানুষ জীবনের কত কিছুই না গুছিয়ে রাখে—জমির কাগজ, টাকার হিসাব, ঘরের আসবাব, সংসারের ভবিষ্যৎ। অথচ সম্পর্কগুলো গুছিয়ে রাখার সময় এলেই কেন যেন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের নিজের হিসাব মেলাতে।
সেই রাতে শায়লা বেগমের সঙ্গে তিনি আরও অনেক কথা বললেন। পুরোনো দিনের গল্প, সন্তানদের শৈশব, হারিয়ে যাওয়া কিছু স্বপ্ন আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলতে বলতে রাত আরও গভীর হলো।

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
মানুষ আজকাল নানা অজুহাতে নিজেদের মধ্যে দেয়াল তুলে দেয়। সম্পর্কের মাঝখানে তৈরি করে বিভাজন, আর সেই বিভাজনকেই একসময় নিজেদের গৌরব বলে মনে করে। অথচ বিভক্ত হওয়া মানে নিজের পৃথিবীটাকে আরও ছোট করে ফেলা, নিজের অস্তিত্বকে সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে রাখা। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বৃহত্তর হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার পরিবর্তে কখনো কখনো ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়াকেই সুখ বলে মেনে নেয়।
শায়লা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— জানো, সব বিচ্ছেদ মানুষের ইচ্ছায় হয় না। কখনো জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, কখনো পরিস্থিতি, আবার কখনো প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়ম মানুষকে ধীরে ধীরে ছোট করে দেয়। একটা সময় আসে, যখন মানুষ নিজের ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিতে দিতে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, যেখানে তার আর কিছু হারানোরও থাকে না।
কথাগুলো শুনে রহিম উদ্দিন চুপ করে রইলেন।
পৌষের শীত। রাত তখন গভীর হওয়ার পথে। কনকনে ঠান্ডা বাতাসে কাঁপছে গ্রামের পুরোনো বাড়ির উঠান। উঠানের এক পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি নারকেল আর সুপারি গাছ। গাছের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ঝরে যাওয়া ফুল। একসময় যে ফুলগুলো গাছের সৌন্দর্য বাড়িয়েছিল, আজ সেগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অপেক্ষায়।
রহিম উদ্দিন সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— আমিও এখন ঠিক ওই ঝরে পড়া ফুলগুলোর মতো। একসময় এই বাড়িতে আমারও একটা মূল্য ছিল। আমার কথায় সবাই বসত, আমার সিদ্ধান্তে সংসারের কাজ চলত। আর আজ মনে হয়, আমি যেন এই বাড়ির একটা অপ্রয়োজনীয় মানুষ। জীবনও একদিন ওই ফুলগুলোর মতো টুপ করে ঝরে পড়বে। কেউ হয়তো খেয়ালও করবে না।
শায়লা বেগম স্বামীর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে অভিমান, মুখে চাপা কষ্ট।
— তুমি এমন কথা বলছ কেন? তুমি কি জানো না, তোমার কষ্ট আমারও কষ্ট?
রহিম উদ্দিন হেসে বললেন,
— জানি। কিন্তু সব কষ্ট কি কাউকে বোঝানো যায়, শায়লা?
আকাশে তখন আধখানা চাঁদ। চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই, সূর্যের কাছ থেকে ধার করা আলো দিয়েই সে পৃথিবীকে রূপালি করে তোলে। অথচ সেই ধার করা আলোতেও কত মায়া, কত সৌন্দর্য! রাতের আকাশে ছড়িয়ে থাকা তারাগুলো যেন নীরবে লিখে চলেছে কোনো অজানা কবির না-বলা কবিতা।
রহিম উদ্দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— দেখো শায়লা, চাঁদটা আজ কী সুন্দর! মনে হয়, কেউ যেন সারা আকাশজুড়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছে।
তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি মেশানো কণ্ঠে বললেন,
— জানো, পূর্ণিমার চাঁদও ঠিক তোমার মতো।
শায়লা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন।
— আমার মতো মানে?
— মানে, চাঁদ রাতকে সুন্দর করে, আর তুমি আমার জীবনটাকে। চাঁদের জ্যোৎস্না পৃথিবীকে আলোকিত করে, আর তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার অন্ধকার মনটাও আলো খুঁজে পায়। তোমার সৌন্দর্যের কাছে আকাশের সব তারাও হার মানবে।
কথা শেষ করে রহিম উদ্দিন এমনভাবে হেসে উঠলেন, যেন এই শীতের রাতে তাঁর মনে কোনো দুঃখই নেই।
শায়লা বেগম মুখে বিরক্তি দেখিয়ে বললেন,
— বুড়ো বয়সে তোমার এসব কথা শুনলে কে বিশ্বাস করবে?
রহিম উদ্দিন আবার হাসলেন।
— ভালোবাসার কি কোনো বয়স আছে? মানুষ বুড়ো হয়, শরীর বুড়ো হয়, কিন্তু মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা ভালোবাসাগুলো বুড়ো হয় না।
শায়লা বেগম আর কিছু বললেন না। শুধু মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে যে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছিল, তা রহিম উদ্দিনের চোখ এড়াল না।
চারদিকে তখন গভীর নীরবতা। দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কুকুরের ডাক। বাঁশঝাড়ের পাতায় পাতায় শীতের বাতাসের মৃদু শব্দ। প্রকৃতির এই শান্ত রূপ মনকে প্রশান্ত করার কথা, অথচ রহিম উদ্দিনের ভেতরটা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে।
কারণ, আজকের রাতটা অন্য রাতের মতো নয়।
আজ এই বাড়িতে তাঁদের একসঙ্গে যৌথ পরিবার হিসেবে থাকার শেষ রাত।
আগামীকাল থেকে তাঁরা আলাদা হয়ে যাবেন। একই উঠান থাকবে, একই বাড়ির আকাশ থাকবে, হয়তো নারকেল গাছগুলোর ছায়াও আগের মতোই পড়বে—কিন্তু মানুষগুলো আর আগের মতো একসঙ্গে থাকবে না।
সংসারের হিসাব-নিকাশ, জমিজমা, ঘরবাড়ি আর ছোটখাটো মনোমালিন্য ধীরে ধীরে এমন এক দেয়াল তৈরি করেছে, যার ওপাশে এখন আপন মানুষগুলোও পর হয়ে যাচ্ছে।
রহিম উদ্দিন জানেন, বয়সের এই প্রান্তে এসে নতুন করে সংসার গুছিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যে উঠানে সন্তানদের বড় হতে দেখেছেন, যে ঘরে পরিবারের সবার হাসি-কান্না ভাগ করে নিয়েছেন, সেই উঠান ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবতেই তাঁর বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে।
তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— শায়লা, একটা কথা বলব?
— বলো।
— কাল থেকে আমরা আলাদা হয়ে যাব। কিন্তু বলো তো, আলাদা হলেই কি মানুষ সত্যিই আলাদা হয়ে যায়? একই মায়ের পেটের ভাইয়েরা আলাদা ঘরে থাকবে, একই উঠানে আর একসঙ্গে বসে খাওয়া হবে না—এই কি জীবনের শেষ কথা?
শায়লা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— ঘর আলাদা হলে মানুষ আলাদা হয় না, রহিম। মানুষ আলাদা হয় তখন, যখন একে অপরের কষ্ট বোঝার ইচ্ছেটুকু হারিয়ে ফেলে। একই ছাদের নিচে থেকেও অনেকে পর হয়ে যায়, আবার দূরে থেকেও কেউ কেউ আপন থাকে।
রহিম উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— কথাটা ঠিক। কিন্তু এত বছরের সংসারটা এভাবে ভেঙে যেতে দেখলে কষ্ট হয়। এই উঠানের প্রতিটি কোণে আমাদের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। কোথায় যেন ছোট ছেলেটা প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, কোথায় বড় ছেলেটার বিয়ের পর সবাই মিলে বসেছিলাম, কোন ঘরে বসে মেয়ের বিদায়ের দিন কেঁদেছিলে—সব মনে পড়ছে। কাল থেকে হয়তো সব থাকবে, শুধু আগের মতো করে আমরা থাকব না।
শায়লা বেগম এবার স্বামীর পাশে এসে বসলেন। তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— কিছু সম্পর্ক দূরত্বে ভাঙে না, রহিম। ভাঙে অবহেলায়। আমরা শুধু চেষ্টা করব, যেন আমাদের হৃদয়ের দরজাটা বন্ধ না হয়ে যায়।
রহিম উদ্দিন স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
চাঁদের আলো তখন উঠানের মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ঝরে যাওয়া ফুলগুলোর ওপর সেই আলো পড়ে তাদেরও যেন এক ধরনের সৌন্দর্য দিয়েছে। রহিম উদ্দিনের মনে হলো, মানুষের জীবনও বোধ হয় এমনই। কিছু মানুষ ঝরে যায়, কিছু সম্পর্ক মাটিতে মিশে যায়, তবু তাদের স্মৃতি কোনো এক নীরব রাতে ফিরে এসে বুকের ভেতর কাঁপন তোলে।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
— আব্বা, তোমরা এখনো উঠানে বসে আছ কেন? কাল সকালে তো অনেক কাজ!
রহিম উদ্দিন চমকে উঠলেন। বড় ছেলে সাইফুল দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— আসছি বাবা, আর একটু বসি।
সাইফুল কিছু না বলে ঘরের ভেতরে চলে গেল।
রহিম উদ্দিন আবার আকাশের দিকে তাকালেন। মনে মনে ভাবলেন, মানুষ জীবনের কত কিছুই না গুছিয়ে রাখে—জমির কাগজ, টাকার হিসাব, ঘরের আসবাব, সংসারের ভবিষ্যৎ। অথচ সম্পর্কগুলো গুছিয়ে রাখার সময় এলেই কেন যেন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের নিজের হিসাব মেলাতে।
সেই রাতে শায়লা বেগমের সঙ্গে তিনি আরও অনেক কথা বললেন। পুরোনো দিনের গল্প, সন্তানদের শৈশব, হারিয়ে যাওয়া কিছু স্বপ্ন আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলতে বলতে রাত আরও গভীর হলো।

আপনার মতামত লিখুন