কিছু গল্পের শেষ হয়, কিন্তু গল্পের মানুষগুলো হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় পুরোনো কোনো গানের ভেতর, বিকেলের শেষ আলোয়, কিংবা হঠাৎ বেজে ওঠা ফোনের স্ক্রিনে—একটা পরিচিত নাম হয়ে।
আবির ভেবেছিল, নবনীতার সঙ্গে তার গল্পটা শেষ হয়ে গেছে। জীবনের কিছু অধ্যায় বন্ধ করে দিতে হয়, বারবার ফিরে তাকালে শুধু নিজেরই কষ্ট বাড়ে—এ কথা সে বুঝে গিয়েছিল।
তবু কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়। তারপর আর ভুলতে চায় না। শুধু তাদের ছাড়াই বেঁচে থাকার অভ্যাস করে নেয়।
আবিরও তাই করেছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়া, কাজের ব্যস্ততায় দিন পার করা, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এক কাপ চা বানানো—সবকিছু আগের মতোই চলছিল। শুধু আগের মতো ছিল না তার অপেক্ষাগুলো।
একসময় রাত দশটা বাজলেই সে ফোনের স্ক্রিন দেখত। নবনীতা হয়তো মেসেজ দেবে, হয়তো বলবে, কী করছ? হয়তো হঠাৎ করেই জানাবে, আজ তার মন খারাপ।
এখন রাত দশটায়ও ফোন বাজে। অফিসের মেসেজ আসে, বন্ধুরা ফোন করে, পরিচিত মানুষেরা খোঁজ নেয়। কিন্তু আবিরের মন আর আগের মতো চমকে ওঠে না।
সে বুঝে গেছে, সব শব্দ খবর নিয়ে আসে না। কিছু শব্দ শুধু ব্যস্ত রাখে, আর কিছু নীরবতা সারাজীবনের জন্য মনে জায়গা করে নেয়।
নবনীতা ছিল তার জীবনের সেই নীরবতা।
যাকে সে হারিয়েছে, অথচ যার অনুপস্থিতিও আজকাল তার প্রতিদিনের জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে।
------------------------------------------------------------------------------------
সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল।
অফিস থেকে ফিরে আবির জানালার পাশে বসে চা খাচ্ছিল। বাইরে আকাশটা মেঘলা। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। এমন বিকেলে একসময় নবনীতা খুব কথা বলতে চাইত।
সে বলত, জানো আবির, বৃষ্টি হলে আমার মনে হয় পৃথিবীটা একটু শান্ত হয়ে যায়।
আবির হেসে উত্তর দিত, তাহলে তোমার জন্য একটা বৃষ্টির পৃথিবী কিনে রাখব।
নবনীতা জিজ্ঞেস করত, সেখানে তুমি থাকবে?
আবির বলত, ‘তুমি চাইলে থাকব।’
কথাগুলো মনে পড়তেই আবিরের ঠোঁটে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
প্রথমবার সে ফোনটা ধরল না। দ্বিতীয়বার বাজতেই বিরক্ত হয়ে ফোন কানে তুলল।
— হ্যালো?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একটা পরিচিত কণ্ঠ—
— আবির?
আবিরের হাত থেকে চায়ের কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
এই কণ্ঠ সে ভুলে যায়নি। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, নিজের মনকে বুঝিয়েছে যে আর কখনো এই কণ্ঠ শোনার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু কিছু কণ্ঠ মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে থেকে যায়, যেন বহুদিনের নীরবতার পরও তাদের চিনতে এক মুহূর্ত লাগে না।
আবির ধীরে বলল—
— নবনীতা?
ওপাশ থেকে মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
— তুমি চিনতে পেরেছ?
আবির জানালার বাইরে তাকাল।
— কিছু মানুষকে চিনতে নামের প্রয়োজন হয় না।
নবনীতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—
— কেমন আছ, আবির?
এই প্রশ্নটার উত্তর আবিরের কাছে ছিল না।
সে কি বলবে, ভালো আছে? অথচ আজও কিছু কিছু বিকেলে তার মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা কোথাও পেছনে পড়ে আছে।
নাকি বলবে, ভালো নেই? কিন্তু এত দিন পর নবনীতার কাছে নিজের কষ্টের হিসাব দিতে তার ইচ্ছে হলো না।
শেষ পর্যন্ত সে বলল—
— চলছে। তুমি কেমন আছ?
নবনীতা খুব আস্তে বলল—
— আমিও চলছি।
দুটো মানুষ একই প্রশ্নের একই রকম উত্তর দিল। অথচ দুজনেই জানত, চলছি আর ভালো আছি এক কথা নয়।
নবনীতা বলল—
— তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
আবির মৃদু হেসে বলল—
— এত দিন পর?
— হ্যাঁ, এত দিন পর।
— এত দিন ধরে কী কথা জমিয়ে রেখেছিলে?
ওপাশে আবার নীরবতা।
তারপর নবনীতা বলল—
— সব কথা জমিয়ে রাখা যায় না, আবির। কিছু কথা বলতে না পারলে মানুষ নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়।
আবির উত্তর দিল না।
নবনীতা ধীরে বলল—
— তুমি কি আমার ওপর রাগ করে আছ?
আবির জানত, এই প্রশ্নের উত্তর সে অনেক আগেই খুঁজেছে।
প্রথম দিকে রাগ হয়েছিল। খুব হয়েছিল। মনে হয়েছিল, নবনীতা চাইলে হয়তো তাদের গল্পটা অন্য রকম হতে পারত। একটু সাহস, একটু চেষ্টা, একটু দৃঢ়তা—হয়তো সবকিছু বদলে যেত।
তারপর একসময় সে বুঝেছে, ভালোবাসার গল্পে সব সময় একজন অপরাধী থাকে না। কখনো কখনো দুজন মানুষই ভালোবাসে, কিন্তু জীবনকে একসঙ্গে বেছে নেওয়ার সাহস তাদের সমান হয় না।
আবির বলল—
— রাগ করে থাকলে হয়তো এত দিনে তোমাকে ঘৃণা করতে শিখে যেতাম। আমি সেটা পারিনি।
নবনীতার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— তুমি আমাকে ভুলে গেছ?
আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— মানুষ কি সবকিছু ভুলে যায়, নবনীতা? কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলো মনে করতে হয় না। নিজের অজান্তেই মনে পড়ে যায়।
ফোনের ওপাশে নবনীতা কেঁদে ফেলল।
আবির চোখ বন্ধ করল।
একসময় এই কান্না থামানোর জন্য সে পৃথিবীর সবকিছু করতে পারত। আজও তার ইচ্ছে হলো মেয়েটাকে বলুক, কেঁদো না, আমি আছি।
কিন্তু সময় বদলে গেছে।
এখন আর সে নবনীতার সেই মানুষটি নয়, যার কাছে মেয়েটা কাঁদলে নিশ্চিন্তে মাথা রাখতে পারত।
অনেকক্ষণ পর নবনীতা বলল—
— আবির, তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?
আবির জানত, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তার নিজের সঙ্গে একটু কথা বলা প্রয়োজন।
তবু সে বলল—
— পারো।
— কোথায় দেখা করবে?
আবির জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল—
— সেই পুরোনো জায়গাটায়। ধানমন্ডি লেকের পাশে।
নবনীতা ফিসফিস করে বলল—
— তোমার মনে আছে?
আবির মৃদু হেসে উত্তর দিল—
— কিছু জায়গা ভুলে যাওয়া যায় না। কারণ সেখানে শুধু মানুষ থাকে না, নিজের একটা পুরোনো জীবনও পড়ে থাকে।
---------------------------------------------------------------------------------
শুক্রবার বিকেলে আবির যথাসময়ে পৌঁছে গেল।
ধানমন্ডি লেকের সেই পথটা খুব একটা বদলায়নি। একই রকম গাছ, একই রকম বেঞ্চ, একই রকম বিকেলের আলো। শুধু তাদের বয়স বেড়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে, আর দুজনের মাঝখানে জমেছে অনেকগুলো না-বলা কথা।
আবির একটা বেঞ্চে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ পর দূরে নবনীতাকে দেখা গেল।
হালকা রঙের পোশাক, কাঁধে ব্যাগ, চোখে সেই পরিচিত কাজল। মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
আবিরের মনে হলো, সময় কখনো কখনো খুব নিষ্ঠুর রকমের সুন্দর হয়। সে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতির চেহারাটা ঠিক আগের মতো রেখে দেয়।
নবনীতা সামনে এসে দাঁড়াল।
— অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?
আবির মাথা নাড়ল।
— না। এই জায়গাটায় অপেক্ষা করতে আমার আপত্তি নেই।
নবনীতা একটু হাসল। তারপর তার পাশে বসল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
একসময় নবনীতা বলল—
— তোমাকে আগের চেয়ে অনেক শান্ত মনে হচ্ছে।
আবির বলল—
— মানুষ কষ্ট পেলে প্রথমে অনেক কথা বলে। তারপর একসময় বুঝতে পারে, সব কষ্টের ব্যাখ্যা দিতে নেই।
— তুমি কি খুব কষ্ট পেয়েছিলে?
আবির তার দিকে তাকাল।
— তুমি কি সত্যিই জানতে চাও, নাকি শুধু নিজের অপরাধবোধটা একটু কমাতে চাইছ?
প্রশ্নটা শুনে নবনীতা থমকে গেল।
আবির বুঝতে পারল, কথাটা হয়তো একটু কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু এত দিন ধরে নিজের ভেতরে যে কথাগুলো সে জমিয়ে রেখেছিল, সেগুলোকে আর সুন্দর করে সাজাতে ইচ্ছে করল না।
নবনীতা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল—
— হয়তো দুটোই। আমি জানি না।
আবির মৃদু স্বরে বলল—
— আমি তোমাকে দোষী করতে চাই না, নবনীতা। শুধু চাই, আমাদের গল্পটা নিয়ে তুমি নিজের কাছে অন্তত সত্যিটা বলো। তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে, সেটা আমি জানি। কিন্তু তুমি কি কখনো আমাদের একসঙ্গে থাকার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়তে চেয়েছিলে?
নবনীতা কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখে জল জমে উঠল।
কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দিতে হয় না। মানুষের নীরবতাই কখনো কখনো সব বলে দেয়।
আবির আর প্রশ্ন করল না।
অনেকক্ষণ পর নবনীতা বলল—
— আমি ভয় পেয়েছিলাম।
— কীসের ভয়?
— পরিবারকে হারানোর ভয়। তাদের কষ্ট দেওয়ার ভয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম, তোমার জন্য সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার পর যদি কোনোদিন তুমি আমার পাশে না থাকো?
আবির চুপ করে শুনছিল।
নবনীতা বলল—
— আমি জানি, আমার এই ভয় তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তুমি হয়তো ভাবতে, আমি তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসিনি।
আবির মাথা নিচু করল।
— একটা সময় সত্যিই তা ভেবেছিলাম। পরে বুঝেছি, ভালোবাসা আর সাহস এক জিনিস নয়। তুমি হয়তো আমাকে ভালোবেসেছিলে, কিন্তু সেই ভালোবাসার দায়িত্ব নিতে পারোনি।
নবনীতা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ?
আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— আমি তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করেছি। কিন্তু ক্ষমা করে দেওয়া আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া এক কথা নয়।
কথাটা শুনে নবনীতা মুখ তুলে তাকাল।
আবিরের চোখে রাগ ছিল না। অভিযোগও ছিল না।
ছিল শুধু একটা গভীর ক্লান্তি, যা দীর্ঘদিনের অপেক্ষা আর অপূর্ণতার ভেতর দিয়ে তৈরি হয়।
নবনীতা খুব আস্তে বলল—
— তুমি কি এখন আর আমাকে ভালোবাসো না?
আবির উত্তর দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ লেকের পানির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
— ভালোবাসা হয়তো একদিনে শেষ হয় না। কিন্তু একা একা সেই ভালোবাসা বয়ে নিয়ে চলতে চলতে মানুষ বদলে যায়। আগে তোমাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারতাম না। এখন তোমাকে মনে পড়লেও নিজের ভবিষ্যৎ থামিয়ে রাখি না।
নবনীতা মাথা নিচু করে ফেলল।
— আমি যদি সেদিন তোমার হাতটা না ছাড়তাম?
আবির মৃদু হেসে বলল—
— তাহলে হয়তো আজ আমাদের গল্পটা অন্য রকম হতো। কিন্তু জীবন তো যদি দিয়ে চলে না, নবনীতা। আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছি, তার ফল নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে।
সেদিন বিকেলে তারা অনেক কথা বলেছিল।
পুরোনো স্মৃতি নিয়ে, হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে, নিজেদের বদলে যাওয়া জীবন নিয়ে।
কিন্তু কেউ কাউকে ফিরে আসতে বলেনি।
কারণ দুজনেই বুঝতে পেরেছিল, কিছু দরজা আবার খোলা যায় ঠিকই, কিন্তু তার ওপাশের ঘরটা আর আগের মতো থাকে না।
-----------------------------------------------------------------------------------
সন্ধ্যা নামার আগে নবনীতা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট খাম বের করল।
খামটা আবিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
— এটা তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম অনেক দিন আগে।
আবির খামটা হাতে নিল।
— কী আছে এতে?
— একটা চিঠি। যেদিন তোমার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল, সেদিন রাতে লিখেছিলাম। কিন্তু পাঠানোর সাহস হয়নি।
আবির খামটা খুলল না।
শুধু হাতে নিয়ে বসে রইল।
নবনীতা বলল—
— তুমি চাইলে এখনই পড়ে দেখতে পারো।
আবির মাথা নাড়ল।
— পরে পড়ব।
— কেন?
আবির একটু হেসে বলল—
— এত দিন ধরে তোমার না-বলা কথাগুলোর উত্তর খুঁজেছি। আজ আর তাড়াহুড়ো করতে ইচ্ছে করছে না।
নবনীতা কিছু বলল না।
তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—
— আবির, তুমি কি কখনো আমাকে আবার নতুন করে চিনতে চাইবে?
আবির অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— নতুন করে?
— হ্যাঁ। আগের সবকিছু ভুলে নয়। বরং আগের সবকিছু জেনেই। যদি কোনোদিন আমরা আবার কথা বলতে পারি, যদি বন্ধু হয়ে থাকতে পারি, যদি তোমার জীবনে একটু জায়গা পাই...
কথাটা শেষ করতে পারল না নবনীতা।
আবির অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
একসময় সে বলল—
— নবনীতা, তোমাকে আমি অপরিচিত করতে পারব না। তুমি আমার জীবনের এমন একটা সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছ, যেটা আমি অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু তোমাকে আবার নিজের জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার সাহস আমার এখন নেই।
নবনীতার চোখে জল চিকচিক করছিল।
আবির বলল—
— আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে বুঝিয়েছি যে তোমাকে ছাড়াও আমার জীবন আছে। এখন যদি আবার আগের মতো অপেক্ষা করতে শুরু করি, যদি তোমার প্রতিটি কথার ভেতর নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি খুঁজতে থাকি, তাহলে হয়তো আবার ভেঙে পড়ব। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। শুধু নিজের শান্তিটুকু আর হারাতে চাই না।
নবনীতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তাহলে কি আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই?
আবির তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল—
— ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কোনো রায় দিতে চাই না। তবে আজ আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই আবার তোমাকে পাওয়ার দাবি করছি না। আর তোমাকে হারানোর ভয়েও নিজের জীবন থামিয়ে রাখতে চাই না।
নবনীতা এবার মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
আবিরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তবু সে নিজেকে সামলে রাখল।
কিছু ভালোবাসায় সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, প্রিয় মানুষটাকে কাঁদতে দেখেও এমন কোনো প্রতিশ্রুতি না দেওয়া, যা হয়তো পরে রাখতে পারবে না।
বিদায়ের সময় নবনীতা বলল—
— তুমি কি চিঠিটা পড়বে?
আবির খামটা পকেটে রেখে বলল—
— পড়ব।
— আর আমাকে জানাবে, কী মনে হলো?
আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— চিঠির উত্তর হয়তো দেব। কিন্তু সেই উত্তরের জন্য অপেক্ষা কোরো না।
নবনীতা চোখ মুছে মাথা নাড়ল।
তারপর দুজন দুদিকে হাঁটতে শুরু করল।
একসময় যে পথ ধরে পাশাপাশি হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল তারা, সেই পথেই আজ দুজনের ছায়া আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
আবির একবারও পেছনে তাকাল না।
কারণ সে জানত, পেছনে তাকালে হয়তো আবার থেমে যাবে।
আর এবার সে থামতে চায়নি।
------------------------------------------------------------------------------
রাতে বাসায় ফিরে আবির অনেকক্ষণ খামটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলল।
নবনীতার হাতের লেখা।
প্রথম লাইনটা পড়েই আবিরের বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
আবির,
তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসে বুঝতে পারছি, কিছু মানুষকে হারানোর পর তাদের কাছে বলার মতো কথাই সবচেয়ে বেশি জমে থাকে। অথচ যখন মানুষটা পাশে থাকে, তখন সেই কথাগুলো বলার সাহস হয় না।
তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে। আমি জানি। হয়তো আমার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিলে আমাদের গল্পটাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, আবির। এখনও ভালোবাসি কি না, সেই উত্তর দিতে গেলে নিজের কাছেই লুকোতে হয়।
আমি জানি না, আমার জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। জানি না, কোনোদিন তোমার পাশে দাঁড়িয়ে বলতে পারব কি না যে আমি আমার ভয়গুলোকে জয় করেছি। শুধু জানি, তোমাকে হারানোর পর পৃথিবী থেমে থাকেনি, কিন্তু আমার ভেতরের একটা জায়গা যেন সেই দিনটাতেই আটকে গেছে।
কখনো কখনো তোমাকে ফোন করতে ইচ্ছে করে। বলতে ইচ্ছে করে, আজ আমার খুব মন খারাপ। তোমার কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করে। আবার ভয় হয়, তুমি যদি ফোন ধরেও আগের মতো কথা না বলো? তুমি যদি আমাকে এমন একজন মানুষ ভেবে থাকো, যে শুধু নিজের প্রয়োজনেই ফিরে আসে?
আবির, আমি জানি, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। হয়তো আমার ভালোবাসার চেয়ে আমার ভয়গুলো বড় হয়ে উঠেছিল। তোমার কাছে থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সেই ইচ্ছের জন্য প্রয়োজনীয় সাহসটা ছিল না।
তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চাই, কিন্তু জানি না ক্ষমা চাওয়ার অধিকারটুকুও আমার আছে কি না।
তুমি যদি কোনোদিন আমাকে ভুলে যাও, আমি তোমাকে দোষ দেব না। বরং চাইব, তুমি এমন কাউকে পাও, যে তোমাকে ভালোবাসার পাশাপাশি তোমার পাশে দাঁড়ানোর সাহসও রাখে। যে তোমাকে শুধু সুন্দর সুন্দর কথা বলবে না, তোমার সঙ্গে কঠিন সময়গুলোও পার করবে।
আর যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, তাহলে শুধু এটুকু ভেবো—একটা মেয়ে ছিল, যে তোমাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু নিজের ভয়গুলোর কাছে হেরে গিয়েছিল।
আমি তোমার কাছে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না। শুধু বলতে পারি, তোমার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমার জীবনের মিথ্যে কোনো অধ্যায় ছিল না।
তুমি আমার জীবনে এসেছিলে বলেই বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসা কতটা সুন্দর হতে পারে। আর তোমাকে হারিয়েছি বলেই বুঝেছি, সেই সৌন্দর্য হারানোর কষ্ট কতটা গভীর।
ভালো থেকো, আবির।
কোনো এক বৃষ্টির দিনে যদি আমার কথা মনে পড়ে, নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। শুধু মনে রেখো, একসময় আমাদের দুজনেরই একটা ছোট্ট পৃথিবী ছিল। সেই পৃথিবীটা ভেঙে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে যে ভালোবাসা ছিল, সেটা মিথ্যে ছিল না।
ইতি,
নবনীতা।
চিঠিটা শেষ করতে করতে আবির বুঝতে পারল না, কখন তার চোখ ভিজে উঠেছে।
কত দিন পর সে নবনীতার হাতের লেখা দেখল!
একটা সময় ছিল, মেয়েটার লেখা একটা ছোট্ট মেসেজও সে বারবার পড়ত। কোনো শব্দের শেষে অতিরিক্ত একটা হাসির চিহ্ন থাকলে তার অর্থ খুঁজত। নবনীতা ভালো থেকো লিখলে ভাবত, মেয়েটা হয়তো তাকে খুব মনে করছে।
আজও সেই হাতের লেখা পড়তে পড়তে আবিরের মনে হলো, কিছু অনুভূতি সময়ের কাছে হারে না। শুধু তাদের প্রকাশের ধরন বদলে যায়।
সে চিঠিটা ভাঁজ করে ড্রয়ারে রেখে দিল।
তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
আবির মনে মনে বলল—
ভালো থেকো, নবনীতা। তোমাকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন হয়তো আর দেখব না। কিন্তু তোমার জন্য একসময় আমার পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে উঠেছিল—এই সত্যিটুকু কোনোদিন অস্বীকার করব না।
সেদিন বহুদিন পর আবিরের ঘুম এসেছিল।
কষ্টের সবটুকু শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে নয়, বরং সে বুঝতে পেরেছিল—কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও অতীত বদলায় না। আর সব ভালোবাসার সমাপ্তি একসঙ্গে থাকা নয়।
কিছু ভালোবাসার সমাপ্তি হলো, কাউকে তার মতো করে ছেড়ে দিয়ে নিজের জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করা।
-----------------------------------------------------------------------------------------
এরপর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।
আবির আর নবনীতার কথা হয়নি।
কখনো কখনো ফোন হাতে নিয়ে আবিরের মনে হতো, মেয়েটাকে একটা মেসেজ দেবে। জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছে। তারপর নিজেই থেমে যেত।
সে জানত, খোঁজ নেওয়া আর অপেক্ষা শুরু করা এক জিনিস নয়। তবু নিজের মনকে সে আর কোনো অস্পষ্ট আশার কাছে বন্দি করতে চাইছিল না।
একদিন বিকেলে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় ফোনে একটা মেসেজ এল।
নবনীতা লিখেছে—
আবির, আজ বৃষ্টি হচ্ছে। তোমার কথা মনে পড়ল। জানি, তোমাকে বিরক্ত করা উচিত নয়। শুধু বলতে ইচ্ছে হলো, আশা করি তুমি সত্যিই ভালো আছ।
আবির মেসেজটা পড়ল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল। আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। রাস্তায় মানুষ ছাতা মাথায় হাঁটছে। কোনো এক চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে।
একসময় এমন বৃষ্টির দিনে সে নবনীতার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত।
আজও তার মনে পড়ল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এবার সেই স্মৃতির সঙ্গে শুধু কষ্ট ছিল না। ছিল এক ধরনের শান্তিও।
সে লিখল—
ভালো আছি, নবনীতা। তুমিও ভালো থেকো। আর হ্যাঁ, বৃষ্টির দিনে মন খারাপ হলে নিজের যত্ন নিতে ভুলো না।
মেসেজটা পাঠিয়ে আবির ফোনটা পকেটে রেখে দিল।
ওপাশ থেকে উত্তর এল কি না, সে দেখল না।
তার সামনে অনেকটা পথ পড়ে আছে। সেই পথে হয়তো নতুন মানুষ আসবে, নতুন গল্প তৈরি হবে, নতুন কোনো বিকেলে সে আবার কারও জন্য অপেক্ষা করবে।
আর নবনীতা?
সে থাকবে আবিরের জীবনের একটা সত্যি হয়ে। এমন এক সত্যি, যাকে বদলানোর প্রয়োজন নেই, মুছে ফেলারও প্রয়োজন নেই।
কারণ মানুষ সবসময় তার প্রিয় মানুষটাকে ফিরে পেয়ে বড় হয় না। কখনো কখনো তাকে হারিয়েও বড় হতে হয়।
আবির হাঁটতে শুরু করল।
বৃষ্টির ফোঁটা তার চুলে, কাঁধে এসে পড়ছিল। সে ছাতা খুলল না।
তার মনে হলো, জীবনের কিছু বৃষ্টি ভিজে নেওয়াই ভালো। সবকিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখলে একসময় নিজের অনুভূতিগুলোকেও আর চেনা যায় না।
সেদিন আবির বুঝেছিল, নবনীতাকে সে হারায়নি শুধু। নবনীতার সঙ্গে থাকা নিজের একটা পুরোনো সংস্করণকেও পেছনে ফেলে এসেছে।
যে আবির রাত জেগে অপেক্ষা করত, প্রতিটি নীরবতার অর্থ খুঁজত, একটা ছোট্ট মেসেজের জন্য নিজের সমস্ত আনন্দ আটকে রাখত—সেই আবির আর নেই।
এখনও নবনীতার কথা মনে পড়লে তার বুকের কোথাও ব্যথা হয়। কিন্তু সেই ব্যথা আর তাকে থামিয়ে দেয় না।
এটাই হয়তো বড় হয়ে ওঠা।
এটাই হয়তো ভালোবাসার আরেকটি রূপ।
-----------------------------------------------------------------------------------
অনেক দিন পর এক বিকেলে আবির তার পুরোনো ডায়েরিটা খুলল।
পাতার এক কোণে বহু আগে লেখা একটা বাক্য চোখে পড়ল—
নবনীতা, তুমি যদি কোনোদিন ফিরে আসো, আমি তোমাকে আবারও ভালোবাসব।
আবির বাক্যটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর কলম হাতে নিয়ে নিচে লিখল—
নবনীতা, তুমি ফিরে এসেছিলে। আমি তোমার সঙ্গে কথাও বলেছি। তোমার চোখের জল দেখেছি, তোমার না-বলা কথাগুলো শুনেছি। কিন্তু এবার বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসা আর তার সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করা এক নয়।
তুমি আমার জীবনের সুন্দর একটা অধ্যায় ছিলে। আমি সেই অধ্যায়কে সম্মান করি। কিন্তু বইয়ের একই পৃষ্ঠা বারবার পড়তে থাকলে পরের গল্পগুলো আর কখনো পড়া হয় না।
তাই এবার আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়, তোমাকে মনে রেখেও নিজের জীবনটাকে ভালোবাসার জন্য।
ডায়েরিটা বন্ধ করে আবির জানালার পাশে দাঁড়াল।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। আকাশে কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছিল নিজেদের গন্তব্যে।
আবির ভাবল, ভালোবাসা হয়তো এমনই। কেউ কারও জীবনে আসে, কিছু স্বপ্ন দেখায়, কিছু স্মৃতি দিয়ে যায়। তারপর একদিন আলাদা পথে চলে যায়। তবু সেই মানুষটার সঙ্গে কাটানো সময়টুকু জীবনের ভেতর থেকে যায়—নীরব, নির্ভার, অথচ গভীর।
নবনীতা আর আবিরের গল্পে হয়তো এক ছাদের নিচে থাকা হলো না।
হয়তো কোনোদিন তাদের একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা হবে না, কোনো চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা হবে না, কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে কেউ কাউকে বলবে না, ভালো থেকো, আমি আছি।
তবু তাদের ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে গেল না।
কারণ কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না, কিন্তু তাদের ভালোবাসার অভিজ্ঞতাটুকু সারাজীবন সঙ্গে নিয়ে চলা যায়।
নবনীতা ছিল আবিরের জীবনের সেই মানুষ, যাকে সে একসময় নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিল। আর পরে বুঝেছিল, কেউ কেউ ভবিষ্যৎ হয়ে আসে না—তারা স্মৃতি হয়ে আমাদের ভেতরে থেকে যায়।
আর আবির?
সে এবার অপেক্ষা করা বন্ধ করল।
তবে নবনীতাকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়।
নিজের জীবনটাকে আবার ভালোবাসতে শেখার জন্য।
বিষয় : গল্প নবনীতা স্মৃতির শহরে তুমি

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
কিছু গল্পের শেষ হয়, কিন্তু গল্পের মানুষগুলো হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় পুরোনো কোনো গানের ভেতর, বিকেলের শেষ আলোয়, কিংবা হঠাৎ বেজে ওঠা ফোনের স্ক্রিনে—একটা পরিচিত নাম হয়ে।
আবির ভেবেছিল, নবনীতার সঙ্গে তার গল্পটা শেষ হয়ে গেছে। জীবনের কিছু অধ্যায় বন্ধ করে দিতে হয়, বারবার ফিরে তাকালে শুধু নিজেরই কষ্ট বাড়ে—এ কথা সে বুঝে গিয়েছিল।
তবু কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়। তারপর আর ভুলতে চায় না। শুধু তাদের ছাড়াই বেঁচে থাকার অভ্যাস করে নেয়।
আবিরও তাই করেছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়া, কাজের ব্যস্ততায় দিন পার করা, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এক কাপ চা বানানো—সবকিছু আগের মতোই চলছিল। শুধু আগের মতো ছিল না তার অপেক্ষাগুলো।
একসময় রাত দশটা বাজলেই সে ফোনের স্ক্রিন দেখত। নবনীতা হয়তো মেসেজ দেবে, হয়তো বলবে, কী করছ? হয়তো হঠাৎ করেই জানাবে, আজ তার মন খারাপ।
এখন রাত দশটায়ও ফোন বাজে। অফিসের মেসেজ আসে, বন্ধুরা ফোন করে, পরিচিত মানুষেরা খোঁজ নেয়। কিন্তু আবিরের মন আর আগের মতো চমকে ওঠে না।
সে বুঝে গেছে, সব শব্দ খবর নিয়ে আসে না। কিছু শব্দ শুধু ব্যস্ত রাখে, আর কিছু নীরবতা সারাজীবনের জন্য মনে জায়গা করে নেয়।
নবনীতা ছিল তার জীবনের সেই নীরবতা।
যাকে সে হারিয়েছে, অথচ যার অনুপস্থিতিও আজকাল তার প্রতিদিনের জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে।
------------------------------------------------------------------------------------
সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল।
অফিস থেকে ফিরে আবির জানালার পাশে বসে চা খাচ্ছিল। বাইরে আকাশটা মেঘলা। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। এমন বিকেলে একসময় নবনীতা খুব কথা বলতে চাইত।
সে বলত, জানো আবির, বৃষ্টি হলে আমার মনে হয় পৃথিবীটা একটু শান্ত হয়ে যায়।
আবির হেসে উত্তর দিত, তাহলে তোমার জন্য একটা বৃষ্টির পৃথিবী কিনে রাখব।
নবনীতা জিজ্ঞেস করত, সেখানে তুমি থাকবে?
আবির বলত, ‘তুমি চাইলে থাকব।’
কথাগুলো মনে পড়তেই আবিরের ঠোঁটে একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
প্রথমবার সে ফোনটা ধরল না। দ্বিতীয়বার বাজতেই বিরক্ত হয়ে ফোন কানে তুলল।
— হ্যালো?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একটা পরিচিত কণ্ঠ—
— আবির?
আবিরের হাত থেকে চায়ের কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
এই কণ্ঠ সে ভুলে যায়নি। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, নিজের মনকে বুঝিয়েছে যে আর কখনো এই কণ্ঠ শোনার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু কিছু কণ্ঠ মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে থেকে যায়, যেন বহুদিনের নীরবতার পরও তাদের চিনতে এক মুহূর্ত লাগে না।
আবির ধীরে বলল—
— নবনীতা?
ওপাশ থেকে মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
— তুমি চিনতে পেরেছ?
আবির জানালার বাইরে তাকাল।
— কিছু মানুষকে চিনতে নামের প্রয়োজন হয় না।
নবনীতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—
— কেমন আছ, আবির?
এই প্রশ্নটার উত্তর আবিরের কাছে ছিল না।
সে কি বলবে, ভালো আছে? অথচ আজও কিছু কিছু বিকেলে তার মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা কোথাও পেছনে পড়ে আছে।
নাকি বলবে, ভালো নেই? কিন্তু এত দিন পর নবনীতার কাছে নিজের কষ্টের হিসাব দিতে তার ইচ্ছে হলো না।
শেষ পর্যন্ত সে বলল—
— চলছে। তুমি কেমন আছ?
নবনীতা খুব আস্তে বলল—
— আমিও চলছি।
দুটো মানুষ একই প্রশ্নের একই রকম উত্তর দিল। অথচ দুজনেই জানত, চলছি আর ভালো আছি এক কথা নয়।
নবনীতা বলল—
— তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
আবির মৃদু হেসে বলল—
— এত দিন পর?
— হ্যাঁ, এত দিন পর।
— এত দিন ধরে কী কথা জমিয়ে রেখেছিলে?
ওপাশে আবার নীরবতা।
তারপর নবনীতা বলল—
— সব কথা জমিয়ে রাখা যায় না, আবির। কিছু কথা বলতে না পারলে মানুষ নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়।
আবির উত্তর দিল না।
নবনীতা ধীরে বলল—
— তুমি কি আমার ওপর রাগ করে আছ?
আবির জানত, এই প্রশ্নের উত্তর সে অনেক আগেই খুঁজেছে।
প্রথম দিকে রাগ হয়েছিল। খুব হয়েছিল। মনে হয়েছিল, নবনীতা চাইলে হয়তো তাদের গল্পটা অন্য রকম হতে পারত। একটু সাহস, একটু চেষ্টা, একটু দৃঢ়তা—হয়তো সবকিছু বদলে যেত।
তারপর একসময় সে বুঝেছে, ভালোবাসার গল্পে সব সময় একজন অপরাধী থাকে না। কখনো কখনো দুজন মানুষই ভালোবাসে, কিন্তু জীবনকে একসঙ্গে বেছে নেওয়ার সাহস তাদের সমান হয় না।
আবির বলল—
— রাগ করে থাকলে হয়তো এত দিনে তোমাকে ঘৃণা করতে শিখে যেতাম। আমি সেটা পারিনি।
নবনীতার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— তুমি আমাকে ভুলে গেছ?
আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— মানুষ কি সবকিছু ভুলে যায়, নবনীতা? কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলো মনে করতে হয় না। নিজের অজান্তেই মনে পড়ে যায়।
ফোনের ওপাশে নবনীতা কেঁদে ফেলল।
আবির চোখ বন্ধ করল।
একসময় এই কান্না থামানোর জন্য সে পৃথিবীর সবকিছু করতে পারত। আজও তার ইচ্ছে হলো মেয়েটাকে বলুক, কেঁদো না, আমি আছি।
কিন্তু সময় বদলে গেছে।
এখন আর সে নবনীতার সেই মানুষটি নয়, যার কাছে মেয়েটা কাঁদলে নিশ্চিন্তে মাথা রাখতে পারত।
অনেকক্ষণ পর নবনীতা বলল—
— আবির, তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?
আবির জানত, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তার নিজের সঙ্গে একটু কথা বলা প্রয়োজন।
তবু সে বলল—
— পারো।
— কোথায় দেখা করবে?
আবির জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল—
— সেই পুরোনো জায়গাটায়। ধানমন্ডি লেকের পাশে।
নবনীতা ফিসফিস করে বলল—
— তোমার মনে আছে?
আবির মৃদু হেসে উত্তর দিল—
— কিছু জায়গা ভুলে যাওয়া যায় না। কারণ সেখানে শুধু মানুষ থাকে না, নিজের একটা পুরোনো জীবনও পড়ে থাকে।
---------------------------------------------------------------------------------
শুক্রবার বিকেলে আবির যথাসময়ে পৌঁছে গেল।
ধানমন্ডি লেকের সেই পথটা খুব একটা বদলায়নি। একই রকম গাছ, একই রকম বেঞ্চ, একই রকম বিকেলের আলো। শুধু তাদের বয়স বেড়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে, আর দুজনের মাঝখানে জমেছে অনেকগুলো না-বলা কথা।
আবির একটা বেঞ্চে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ পর দূরে নবনীতাকে দেখা গেল।
হালকা রঙের পোশাক, কাঁধে ব্যাগ, চোখে সেই পরিচিত কাজল। মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
আবিরের মনে হলো, সময় কখনো কখনো খুব নিষ্ঠুর রকমের সুন্দর হয়। সে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতির চেহারাটা ঠিক আগের মতো রেখে দেয়।
নবনীতা সামনে এসে দাঁড়াল।
— অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?
আবির মাথা নাড়ল।
— না। এই জায়গাটায় অপেক্ষা করতে আমার আপত্তি নেই।
নবনীতা একটু হাসল। তারপর তার পাশে বসল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
একসময় নবনীতা বলল—
— তোমাকে আগের চেয়ে অনেক শান্ত মনে হচ্ছে।
আবির বলল—
— মানুষ কষ্ট পেলে প্রথমে অনেক কথা বলে। তারপর একসময় বুঝতে পারে, সব কষ্টের ব্যাখ্যা দিতে নেই।
— তুমি কি খুব কষ্ট পেয়েছিলে?
আবির তার দিকে তাকাল।
— তুমি কি সত্যিই জানতে চাও, নাকি শুধু নিজের অপরাধবোধটা একটু কমাতে চাইছ?
প্রশ্নটা শুনে নবনীতা থমকে গেল।
আবির বুঝতে পারল, কথাটা হয়তো একটু কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু এত দিন ধরে নিজের ভেতরে যে কথাগুলো সে জমিয়ে রেখেছিল, সেগুলোকে আর সুন্দর করে সাজাতে ইচ্ছে করল না।
নবনীতা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল—
— হয়তো দুটোই। আমি জানি না।
আবির মৃদু স্বরে বলল—
— আমি তোমাকে দোষী করতে চাই না, নবনীতা। শুধু চাই, আমাদের গল্পটা নিয়ে তুমি নিজের কাছে অন্তত সত্যিটা বলো। তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে, সেটা আমি জানি। কিন্তু তুমি কি কখনো আমাদের একসঙ্গে থাকার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়তে চেয়েছিলে?
নবনীতা কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখে জল জমে উঠল।
কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দিতে হয় না। মানুষের নীরবতাই কখনো কখনো সব বলে দেয়।
আবির আর প্রশ্ন করল না।
অনেকক্ষণ পর নবনীতা বলল—
— আমি ভয় পেয়েছিলাম।
— কীসের ভয়?
— পরিবারকে হারানোর ভয়। তাদের কষ্ট দেওয়ার ভয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম, তোমার জন্য সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার পর যদি কোনোদিন তুমি আমার পাশে না থাকো?
আবির চুপ করে শুনছিল।
নবনীতা বলল—
— আমি জানি, আমার এই ভয় তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তুমি হয়তো ভাবতে, আমি তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসিনি।
আবির মাথা নিচু করল।
— একটা সময় সত্যিই তা ভেবেছিলাম। পরে বুঝেছি, ভালোবাসা আর সাহস এক জিনিস নয়। তুমি হয়তো আমাকে ভালোবেসেছিলে, কিন্তু সেই ভালোবাসার দায়িত্ব নিতে পারোনি।
নবনীতা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ?
আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— আমি তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করেছি। কিন্তু ক্ষমা করে দেওয়া আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া এক কথা নয়।
কথাটা শুনে নবনীতা মুখ তুলে তাকাল।
আবিরের চোখে রাগ ছিল না। অভিযোগও ছিল না।
ছিল শুধু একটা গভীর ক্লান্তি, যা দীর্ঘদিনের অপেক্ষা আর অপূর্ণতার ভেতর দিয়ে তৈরি হয়।
নবনীতা খুব আস্তে বলল—
— তুমি কি এখন আর আমাকে ভালোবাসো না?
আবির উত্তর দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ লেকের পানির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
— ভালোবাসা হয়তো একদিনে শেষ হয় না। কিন্তু একা একা সেই ভালোবাসা বয়ে নিয়ে চলতে চলতে মানুষ বদলে যায়। আগে তোমাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারতাম না। এখন তোমাকে মনে পড়লেও নিজের ভবিষ্যৎ থামিয়ে রাখি না।
নবনীতা মাথা নিচু করে ফেলল।
— আমি যদি সেদিন তোমার হাতটা না ছাড়তাম?
আবির মৃদু হেসে বলল—
— তাহলে হয়তো আজ আমাদের গল্পটা অন্য রকম হতো। কিন্তু জীবন তো যদি দিয়ে চলে না, নবনীতা। আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছি, তার ফল নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে।
সেদিন বিকেলে তারা অনেক কথা বলেছিল।
পুরোনো স্মৃতি নিয়ে, হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে, নিজেদের বদলে যাওয়া জীবন নিয়ে।
কিন্তু কেউ কাউকে ফিরে আসতে বলেনি।
কারণ দুজনেই বুঝতে পেরেছিল, কিছু দরজা আবার খোলা যায় ঠিকই, কিন্তু তার ওপাশের ঘরটা আর আগের মতো থাকে না।
-----------------------------------------------------------------------------------
সন্ধ্যা নামার আগে নবনীতা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট খাম বের করল।
খামটা আবিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
— এটা তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম অনেক দিন আগে।
আবির খামটা হাতে নিল।
— কী আছে এতে?
— একটা চিঠি। যেদিন তোমার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল, সেদিন রাতে লিখেছিলাম। কিন্তু পাঠানোর সাহস হয়নি।
আবির খামটা খুলল না।
শুধু হাতে নিয়ে বসে রইল।
নবনীতা বলল—
— তুমি চাইলে এখনই পড়ে দেখতে পারো।
আবির মাথা নাড়ল।
— পরে পড়ব।
— কেন?
আবির একটু হেসে বলল—
— এত দিন ধরে তোমার না-বলা কথাগুলোর উত্তর খুঁজেছি। আজ আর তাড়াহুড়ো করতে ইচ্ছে করছে না।
নবনীতা কিছু বলল না।
তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—
— আবির, তুমি কি কখনো আমাকে আবার নতুন করে চিনতে চাইবে?
আবির অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— নতুন করে?
— হ্যাঁ। আগের সবকিছু ভুলে নয়। বরং আগের সবকিছু জেনেই। যদি কোনোদিন আমরা আবার কথা বলতে পারি, যদি বন্ধু হয়ে থাকতে পারি, যদি তোমার জীবনে একটু জায়গা পাই...
কথাটা শেষ করতে পারল না নবনীতা।
আবির অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
একসময় সে বলল—
— নবনীতা, তোমাকে আমি অপরিচিত করতে পারব না। তুমি আমার জীবনের এমন একটা সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছ, যেটা আমি অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু তোমাকে আবার নিজের জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার সাহস আমার এখন নেই।
নবনীতার চোখে জল চিকচিক করছিল।
আবির বলল—
— আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে বুঝিয়েছি যে তোমাকে ছাড়াও আমার জীবন আছে। এখন যদি আবার আগের মতো অপেক্ষা করতে শুরু করি, যদি তোমার প্রতিটি কথার ভেতর নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি খুঁজতে থাকি, তাহলে হয়তো আবার ভেঙে পড়ব। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। শুধু নিজের শান্তিটুকু আর হারাতে চাই না।
নবনীতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তাহলে কি আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই?
আবির তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল—
— ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কোনো রায় দিতে চাই না। তবে আজ আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই আবার তোমাকে পাওয়ার দাবি করছি না। আর তোমাকে হারানোর ভয়েও নিজের জীবন থামিয়ে রাখতে চাই না।
নবনীতা এবার মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
আবিরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তবু সে নিজেকে সামলে রাখল।
কিছু ভালোবাসায় সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, প্রিয় মানুষটাকে কাঁদতে দেখেও এমন কোনো প্রতিশ্রুতি না দেওয়া, যা হয়তো পরে রাখতে পারবে না।
বিদায়ের সময় নবনীতা বলল—
— তুমি কি চিঠিটা পড়বে?
আবির খামটা পকেটে রেখে বলল—
— পড়ব।
— আর আমাকে জানাবে, কী মনে হলো?
আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— চিঠির উত্তর হয়তো দেব। কিন্তু সেই উত্তরের জন্য অপেক্ষা কোরো না।
নবনীতা চোখ মুছে মাথা নাড়ল।
তারপর দুজন দুদিকে হাঁটতে শুরু করল।
একসময় যে পথ ধরে পাশাপাশি হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল তারা, সেই পথেই আজ দুজনের ছায়া আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
আবির একবারও পেছনে তাকাল না।
কারণ সে জানত, পেছনে তাকালে হয়তো আবার থেমে যাবে।
আর এবার সে থামতে চায়নি।
------------------------------------------------------------------------------
রাতে বাসায় ফিরে আবির অনেকক্ষণ খামটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলল।
নবনীতার হাতের লেখা।
প্রথম লাইনটা পড়েই আবিরের বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
আবির,
তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসে বুঝতে পারছি, কিছু মানুষকে হারানোর পর তাদের কাছে বলার মতো কথাই সবচেয়ে বেশি জমে থাকে। অথচ যখন মানুষটা পাশে থাকে, তখন সেই কথাগুলো বলার সাহস হয় না।
তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে। আমি জানি। হয়তো আমার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিলে আমাদের গল্পটাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, আবির। এখনও ভালোবাসি কি না, সেই উত্তর দিতে গেলে নিজের কাছেই লুকোতে হয়।
আমি জানি না, আমার জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। জানি না, কোনোদিন তোমার পাশে দাঁড়িয়ে বলতে পারব কি না যে আমি আমার ভয়গুলোকে জয় করেছি। শুধু জানি, তোমাকে হারানোর পর পৃথিবী থেমে থাকেনি, কিন্তু আমার ভেতরের একটা জায়গা যেন সেই দিনটাতেই আটকে গেছে।
কখনো কখনো তোমাকে ফোন করতে ইচ্ছে করে। বলতে ইচ্ছে করে, আজ আমার খুব মন খারাপ। তোমার কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করে। আবার ভয় হয়, তুমি যদি ফোন ধরেও আগের মতো কথা না বলো? তুমি যদি আমাকে এমন একজন মানুষ ভেবে থাকো, যে শুধু নিজের প্রয়োজনেই ফিরে আসে?
আবির, আমি জানি, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। হয়তো আমার ভালোবাসার চেয়ে আমার ভয়গুলো বড় হয়ে উঠেছিল। তোমার কাছে থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সেই ইচ্ছের জন্য প্রয়োজনীয় সাহসটা ছিল না।
তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চাই, কিন্তু জানি না ক্ষমা চাওয়ার অধিকারটুকুও আমার আছে কি না।
তুমি যদি কোনোদিন আমাকে ভুলে যাও, আমি তোমাকে দোষ দেব না। বরং চাইব, তুমি এমন কাউকে পাও, যে তোমাকে ভালোবাসার পাশাপাশি তোমার পাশে দাঁড়ানোর সাহসও রাখে। যে তোমাকে শুধু সুন্দর সুন্দর কথা বলবে না, তোমার সঙ্গে কঠিন সময়গুলোও পার করবে।
আর যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, তাহলে শুধু এটুকু ভেবো—একটা মেয়ে ছিল, যে তোমাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু নিজের ভয়গুলোর কাছে হেরে গিয়েছিল।
আমি তোমার কাছে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না। শুধু বলতে পারি, তোমার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমার জীবনের মিথ্যে কোনো অধ্যায় ছিল না।
তুমি আমার জীবনে এসেছিলে বলেই বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসা কতটা সুন্দর হতে পারে। আর তোমাকে হারিয়েছি বলেই বুঝেছি, সেই সৌন্দর্য হারানোর কষ্ট কতটা গভীর।
ভালো থেকো, আবির।
কোনো এক বৃষ্টির দিনে যদি আমার কথা মনে পড়ে, নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। শুধু মনে রেখো, একসময় আমাদের দুজনেরই একটা ছোট্ট পৃথিবী ছিল। সেই পৃথিবীটা ভেঙে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে যে ভালোবাসা ছিল, সেটা মিথ্যে ছিল না।
ইতি,
নবনীতা।
চিঠিটা শেষ করতে করতে আবির বুঝতে পারল না, কখন তার চোখ ভিজে উঠেছে।
কত দিন পর সে নবনীতার হাতের লেখা দেখল!
একটা সময় ছিল, মেয়েটার লেখা একটা ছোট্ট মেসেজও সে বারবার পড়ত। কোনো শব্দের শেষে অতিরিক্ত একটা হাসির চিহ্ন থাকলে তার অর্থ খুঁজত। নবনীতা ভালো থেকো লিখলে ভাবত, মেয়েটা হয়তো তাকে খুব মনে করছে।
আজও সেই হাতের লেখা পড়তে পড়তে আবিরের মনে হলো, কিছু অনুভূতি সময়ের কাছে হারে না। শুধু তাদের প্রকাশের ধরন বদলে যায়।
সে চিঠিটা ভাঁজ করে ড্রয়ারে রেখে দিল।
তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
আবির মনে মনে বলল—
ভালো থেকো, নবনীতা। তোমাকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন হয়তো আর দেখব না। কিন্তু তোমার জন্য একসময় আমার পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে উঠেছিল—এই সত্যিটুকু কোনোদিন অস্বীকার করব না।
সেদিন বহুদিন পর আবিরের ঘুম এসেছিল।
কষ্টের সবটুকু শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে নয়, বরং সে বুঝতে পেরেছিল—কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও অতীত বদলায় না। আর সব ভালোবাসার সমাপ্তি একসঙ্গে থাকা নয়।
কিছু ভালোবাসার সমাপ্তি হলো, কাউকে তার মতো করে ছেড়ে দিয়ে নিজের জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করা।
-----------------------------------------------------------------------------------------
এরপর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।
আবির আর নবনীতার কথা হয়নি।
কখনো কখনো ফোন হাতে নিয়ে আবিরের মনে হতো, মেয়েটাকে একটা মেসেজ দেবে। জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছে। তারপর নিজেই থেমে যেত।
সে জানত, খোঁজ নেওয়া আর অপেক্ষা শুরু করা এক জিনিস নয়। তবু নিজের মনকে সে আর কোনো অস্পষ্ট আশার কাছে বন্দি করতে চাইছিল না।
একদিন বিকেলে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় ফোনে একটা মেসেজ এল।
নবনীতা লিখেছে—
আবির, আজ বৃষ্টি হচ্ছে। তোমার কথা মনে পড়ল। জানি, তোমাকে বিরক্ত করা উচিত নয়। শুধু বলতে ইচ্ছে হলো, আশা করি তুমি সত্যিই ভালো আছ।
আবির মেসেজটা পড়ল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল। আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। রাস্তায় মানুষ ছাতা মাথায় হাঁটছে। কোনো এক চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে।
একসময় এমন বৃষ্টির দিনে সে নবনীতার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত।
আজও তার মনে পড়ল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এবার সেই স্মৃতির সঙ্গে শুধু কষ্ট ছিল না। ছিল এক ধরনের শান্তিও।
সে লিখল—
ভালো আছি, নবনীতা। তুমিও ভালো থেকো। আর হ্যাঁ, বৃষ্টির দিনে মন খারাপ হলে নিজের যত্ন নিতে ভুলো না।
মেসেজটা পাঠিয়ে আবির ফোনটা পকেটে রেখে দিল।
ওপাশ থেকে উত্তর এল কি না, সে দেখল না।
তার সামনে অনেকটা পথ পড়ে আছে। সেই পথে হয়তো নতুন মানুষ আসবে, নতুন গল্প তৈরি হবে, নতুন কোনো বিকেলে সে আবার কারও জন্য অপেক্ষা করবে।
আর নবনীতা?
সে থাকবে আবিরের জীবনের একটা সত্যি হয়ে। এমন এক সত্যি, যাকে বদলানোর প্রয়োজন নেই, মুছে ফেলারও প্রয়োজন নেই।
কারণ মানুষ সবসময় তার প্রিয় মানুষটাকে ফিরে পেয়ে বড় হয় না। কখনো কখনো তাকে হারিয়েও বড় হতে হয়।
আবির হাঁটতে শুরু করল।
বৃষ্টির ফোঁটা তার চুলে, কাঁধে এসে পড়ছিল। সে ছাতা খুলল না।
তার মনে হলো, জীবনের কিছু বৃষ্টি ভিজে নেওয়াই ভালো। সবকিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখলে একসময় নিজের অনুভূতিগুলোকেও আর চেনা যায় না।
সেদিন আবির বুঝেছিল, নবনীতাকে সে হারায়নি শুধু। নবনীতার সঙ্গে থাকা নিজের একটা পুরোনো সংস্করণকেও পেছনে ফেলে এসেছে।
যে আবির রাত জেগে অপেক্ষা করত, প্রতিটি নীরবতার অর্থ খুঁজত, একটা ছোট্ট মেসেজের জন্য নিজের সমস্ত আনন্দ আটকে রাখত—সেই আবির আর নেই।
এখনও নবনীতার কথা মনে পড়লে তার বুকের কোথাও ব্যথা হয়। কিন্তু সেই ব্যথা আর তাকে থামিয়ে দেয় না।
এটাই হয়তো বড় হয়ে ওঠা।
এটাই হয়তো ভালোবাসার আরেকটি রূপ।
-----------------------------------------------------------------------------------
অনেক দিন পর এক বিকেলে আবির তার পুরোনো ডায়েরিটা খুলল।
পাতার এক কোণে বহু আগে লেখা একটা বাক্য চোখে পড়ল—
নবনীতা, তুমি যদি কোনোদিন ফিরে আসো, আমি তোমাকে আবারও ভালোবাসব।
আবির বাক্যটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর কলম হাতে নিয়ে নিচে লিখল—
নবনীতা, তুমি ফিরে এসেছিলে। আমি তোমার সঙ্গে কথাও বলেছি। তোমার চোখের জল দেখেছি, তোমার না-বলা কথাগুলো শুনেছি। কিন্তু এবার বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসা আর তার সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করা এক নয়।
তুমি আমার জীবনের সুন্দর একটা অধ্যায় ছিলে। আমি সেই অধ্যায়কে সম্মান করি। কিন্তু বইয়ের একই পৃষ্ঠা বারবার পড়তে থাকলে পরের গল্পগুলো আর কখনো পড়া হয় না।
তাই এবার আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়, তোমাকে মনে রেখেও নিজের জীবনটাকে ভালোবাসার জন্য।
ডায়েরিটা বন্ধ করে আবির জানালার পাশে দাঁড়াল।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। আকাশে কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছিল নিজেদের গন্তব্যে।
আবির ভাবল, ভালোবাসা হয়তো এমনই। কেউ কারও জীবনে আসে, কিছু স্বপ্ন দেখায়, কিছু স্মৃতি দিয়ে যায়। তারপর একদিন আলাদা পথে চলে যায়। তবু সেই মানুষটার সঙ্গে কাটানো সময়টুকু জীবনের ভেতর থেকে যায়—নীরব, নির্ভার, অথচ গভীর।
নবনীতা আর আবিরের গল্পে হয়তো এক ছাদের নিচে থাকা হলো না।
হয়তো কোনোদিন তাদের একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা হবে না, কোনো চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা হবে না, কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে কেউ কাউকে বলবে না, ভালো থেকো, আমি আছি।
তবু তাদের ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে গেল না।
কারণ কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না, কিন্তু তাদের ভালোবাসার অভিজ্ঞতাটুকু সারাজীবন সঙ্গে নিয়ে চলা যায়।
নবনীতা ছিল আবিরের জীবনের সেই মানুষ, যাকে সে একসময় নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিল। আর পরে বুঝেছিল, কেউ কেউ ভবিষ্যৎ হয়ে আসে না—তারা স্মৃতি হয়ে আমাদের ভেতরে থেকে যায়।
আর আবির?
সে এবার অপেক্ষা করা বন্ধ করল।
তবে নবনীতাকে ভুলে যাওয়ার জন্য নয়।
নিজের জীবনটাকে আবার ভালোবাসতে শেখার জন্য।

আপনার মতামত লিখুন