একটি দেয়াল। আর মাত্র কয়েক গজের একটা করিডর। দূরত্বটা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামের এই সামান্য দূরত্বটুকুই যেন চিরতরে আলাদা করে দিয়েছিল দুটি ভিন্ন পৃথিবীকে। স্পেনের ড্রেসিংরুমে তখন কান ফাটানো উৎসব, আর ফরাসিদের তাঁবুতে ভর করেছে মহাশ্মশানের নীরবতা। এক ঘরে ফাইনালে ওঠার আকাশছোঁয়া উল্লাস, অন্য ঘরে স্বপ্নভঙ্গের চুরমার হওয়া বেদনা। স্পেন চলে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে, আর ফ্রান্সের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান এখানেই থমকে গেল।
ডালাস স্টেডিয়ামে রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, স্কোরবোর্ডে তখন জ্বলজ্বল করছে— স্পেন ২, ফ্রান্স ০। মাঠে তখন স্প্যানিশ ফুটবলারদের বুনো উন্মাদনা। কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, কেউ দুই হাত আকাশে তুলে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। গ্যালারিতে তখন লাল-হলুদ পতাকার সমুদ্র।
ঠিক তার কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। কারও হাত কোমরে, কেউ মাথা নিচু করে চেয়ে আছেন ঘাসের দিকে। কয়েক মিনিট আগেও যে ফাইনালের স্বপ্ন দুই দলের চোখেই সমান ছিল, ৯০ মিনিট শেষে সেই স্বপ্নটা শুধু স্পেনের একার হয়ে গেল।
টেলিভিশনের ক্যামেরা মাঠের দৃশ্য দেখায়, কিন্তু টানেলের ভেতরের আসল গল্পটা তো সেখানে দেখা যায় না। স্পেনের ড্রেসিংরুমের দরজা বন্ধ থাকলেও আনন্দ কি আর আটকে রাখা যায়! ভেতর থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার, গান আর টেবিল চাপড়ানোর শব্দ। ঘামে ভেজা জার্সি গায়েই টেবিলের ওপর উঠে নাচছিলেন তরুণ তুর্কিরা। বুট খোলারও যেন সময় নেই কারো, কারণ তারা যে এখন বিশ্বজয়ের থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে!
লামিন ইয়ামালদের চোখে তখন আর সেমিফাইনালের ক্লান্তি নেই, আছে শুধু ফাইনালের রোমাঞ্চ। কেউ কেউ ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও কলে মা-বাবা বা স্ত্রীকে শুধু একটি কথাই বলতে পেরেছেন— আমরা ফাইনালে! তারপরই আবার কোলাহল, আবার আলিঙ্গন।
কয়েক গজ দূরের ফরাসি ড্রেসিংরুমে তখন ফোন ধরারও ইচ্ছা ছিল না কারও। ছিল শুধু এক বুক হাহাকার আর নীরবতা। কেউ জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে বেঞ্চে বসে আছেন, কেউ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন— কোথায় ভুলটা হলো? কোন সুযোগটা হাতছাড়া না করলে আজ গল্পটা অন্যরকম হতো?
কোচ দিদিয়ের দেশম হয়তো ভাঙা গলায় সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, বলছিলেন মাথা উঁচু রাখতে। কিন্তু বিদায়ের রাতে সান্ত্বনার শব্দগুলো খুব বেশি হালকা শোনায়। এই সুযোগ আবার পেতে তো দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষা, যা অনেকের ক্যারিয়ারে হয়তো আর কখনোই আসবে না।
কিলিয়ান এমবাপ্পে মাথা নিচু করে যখন বসে ছিলেন, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা স্প্যানিশদের প্রতিটি চিৎকার তীরের মতো তাঁর কানে বিঁধছিল। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ যেমন তাঁর জানা, তেমনি ফাইনালের আগের ধাপে বাদ পড়ার এই তীব্র যন্ত্রণাও তাঁকে পুড়ছিল।
ম্যাচ শুরুর আগে দুই দল একই রেখায় দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু একটি গোল, একটি ভুল পাস কিংবা কয়েক সেকেন্ডের একটা সিদ্ধান্ত বদলে দিল দুটি ড্রেসিংরুমের ভাষা। এক ঘরে যখন বিজয়ী ফুটবলার পরিবারের সাথে ভিডিও কলে হাসছিলেন, ঠিক একই সময়ে পাশের ঘরে কোনো ফরাসি ফুটবলার হয়তো তাঁর ফোনের স্ক্রিনে আসা পরিবারের বার্তা পড়ছিলেন— তোমাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।
কিছুক্ষণ পর দুটি দলই ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে টিম বাসে উঠল। স্প্যানিশদের চোখে তখন ফাইনালের ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন, আর ফরাসিরা ধীর পায়ে বাসে উঠলেন বাড়ি ফেরার টিকিট পকেটে নিয়ে। ডালাস স্টেডিয়ামের সেই দেয়ালটিই প্রমাণ করে দিল— ফুটবল কত দ্রুত মানুষের পৃথিবী বদলে দেয়। এটিই ফুটবলের সবচেয়ে ছোট দূরত্ব, আবার এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ!

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
একটি দেয়াল। আর মাত্র কয়েক গজের একটা করিডর। দূরত্বটা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামের এই সামান্য দূরত্বটুকুই যেন চিরতরে আলাদা করে দিয়েছিল দুটি ভিন্ন পৃথিবীকে। স্পেনের ড্রেসিংরুমে তখন কান ফাটানো উৎসব, আর ফরাসিদের তাঁবুতে ভর করেছে মহাশ্মশানের নীরবতা। এক ঘরে ফাইনালে ওঠার আকাশছোঁয়া উল্লাস, অন্য ঘরে স্বপ্নভঙ্গের চুরমার হওয়া বেদনা। স্পেন চলে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে, আর ফ্রান্সের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান এখানেই থমকে গেল।
ডালাস স্টেডিয়ামে রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, স্কোরবোর্ডে তখন জ্বলজ্বল করছে— স্পেন ২, ফ্রান্স ০। মাঠে তখন স্প্যানিশ ফুটবলারদের বুনো উন্মাদনা। কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, কেউ দুই হাত আকাশে তুলে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। গ্যালারিতে তখন লাল-হলুদ পতাকার সমুদ্র।
ঠিক তার কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। কারও হাত কোমরে, কেউ মাথা নিচু করে চেয়ে আছেন ঘাসের দিকে। কয়েক মিনিট আগেও যে ফাইনালের স্বপ্ন দুই দলের চোখেই সমান ছিল, ৯০ মিনিট শেষে সেই স্বপ্নটা শুধু স্পেনের একার হয়ে গেল।
টেলিভিশনের ক্যামেরা মাঠের দৃশ্য দেখায়, কিন্তু টানেলের ভেতরের আসল গল্পটা তো সেখানে দেখা যায় না। স্পেনের ড্রেসিংরুমের দরজা বন্ধ থাকলেও আনন্দ কি আর আটকে রাখা যায়! ভেতর থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার, গান আর টেবিল চাপড়ানোর শব্দ। ঘামে ভেজা জার্সি গায়েই টেবিলের ওপর উঠে নাচছিলেন তরুণ তুর্কিরা। বুট খোলারও যেন সময় নেই কারো, কারণ তারা যে এখন বিশ্বজয়ের থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে!
লামিন ইয়ামালদের চোখে তখন আর সেমিফাইনালের ক্লান্তি নেই, আছে শুধু ফাইনালের রোমাঞ্চ। কেউ কেউ ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও কলে মা-বাবা বা স্ত্রীকে শুধু একটি কথাই বলতে পেরেছেন— আমরা ফাইনালে! তারপরই আবার কোলাহল, আবার আলিঙ্গন।
কয়েক গজ দূরের ফরাসি ড্রেসিংরুমে তখন ফোন ধরারও ইচ্ছা ছিল না কারও। ছিল শুধু এক বুক হাহাকার আর নীরবতা। কেউ জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে বেঞ্চে বসে আছেন, কেউ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন— কোথায় ভুলটা হলো? কোন সুযোগটা হাতছাড়া না করলে আজ গল্পটা অন্যরকম হতো?
কোচ দিদিয়ের দেশম হয়তো ভাঙা গলায় সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, বলছিলেন মাথা উঁচু রাখতে। কিন্তু বিদায়ের রাতে সান্ত্বনার শব্দগুলো খুব বেশি হালকা শোনায়। এই সুযোগ আবার পেতে তো দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষা, যা অনেকের ক্যারিয়ারে হয়তো আর কখনোই আসবে না।
কিলিয়ান এমবাপ্পে মাথা নিচু করে যখন বসে ছিলেন, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা স্প্যানিশদের প্রতিটি চিৎকার তীরের মতো তাঁর কানে বিঁধছিল। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ যেমন তাঁর জানা, তেমনি ফাইনালের আগের ধাপে বাদ পড়ার এই তীব্র যন্ত্রণাও তাঁকে পুড়ছিল।
ম্যাচ শুরুর আগে দুই দল একই রেখায় দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু একটি গোল, একটি ভুল পাস কিংবা কয়েক সেকেন্ডের একটা সিদ্ধান্ত বদলে দিল দুটি ড্রেসিংরুমের ভাষা। এক ঘরে যখন বিজয়ী ফুটবলার পরিবারের সাথে ভিডিও কলে হাসছিলেন, ঠিক একই সময়ে পাশের ঘরে কোনো ফরাসি ফুটবলার হয়তো তাঁর ফোনের স্ক্রিনে আসা পরিবারের বার্তা পড়ছিলেন— তোমাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।
কিছুক্ষণ পর দুটি দলই ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে টিম বাসে উঠল। স্প্যানিশদের চোখে তখন ফাইনালের ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন, আর ফরাসিরা ধীর পায়ে বাসে উঠলেন বাড়ি ফেরার টিকিট পকেটে নিয়ে। ডালাস স্টেডিয়ামের সেই দেয়ালটিই প্রমাণ করে দিল— ফুটবল কত দ্রুত মানুষের পৃথিবী বদলে দেয়। এটিই ফুটবলের সবচেয়ে ছোট দূরত্ব, আবার এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ!

আপনার মতামত লিখুন