চট্টগ্রামের হালদা নদীর দুই পাড়ে ২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ ইতোমধ্যে বিপন্ন তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে আরও শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ অদূর ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, হালদা নদীর দুই পাড়ে মোট ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদ ৫৮৭টি গণ ও ১৫২টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। শনাক্ত করা উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে ২১২ প্রজাতির বড় বৃক্ষ, ১৩৩ প্রজাতির গুল্ম, ১৩৩ প্রজাতির লতা, ৫২২ প্রজাতির বীরুৎ এবং ৯ প্রজাতির পরজীবী উদ্ভিদ।
বিপন্ন ২৩ প্রজাতির উদ্ভিদের তালিকায় রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন বা লেকুয়া গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, নেরা মিলাতি, পাখা ঢেকিয়া, বনিপদ, মাইল্লা আম, পানিজাম ও চালমুগড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতি। অন্যদিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে বনিপদ, নীলভুট্টা, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুর্চি পাম, নাট অলকুশি, খনা, অশোক, বরুণ ও লবঙ্গ লতাসহ আরও অন্তত ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন হতে পারে।
গবেষণায় শনাক্ত করা উদ্ভিদের মধ্যে স্থানীয় প্রজাতি ৭৬৫টি এবং বিদেশি প্রজাতি ২৪৪টি। এ ছাড়া একবীজপত্রী ২২৩টি ও দ্বিবীজপত্রী ৭৪৯টি প্রজাতি পাওয়া গেছে। শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে দুটি নগ্নবীজি উদ্ভিদ, ১৩টি মসগোত্রীয় এবং ৩৫টি ফার্ন প্রজাতিও রয়েছে। পাশাপাশি সাত প্রজাতির ছত্রাক শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষণায় হালদা নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও উঠে এসেছে। সাধারণত উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে জন্মানো কেওড়া গাছের উপস্থিতি কর্ণফুলীর মোহনা মদুনাঘাট থেকে হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, উজানের দিকে কেওড়া গাছের বিস্তৃতি নদীর পানিতে লবণাক্ততার আধিক্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, যা নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি হতে পারে।
এ ছাড়া নদী দূষণ ও পরিবেশগত ক্ষতির উৎসও চিহ্নিত করা হয়েছে গবেষণায়। অধিকাংশ দূষণের উৎস মদুনাঘাট থেকে নাজিরহাট সেতু পর্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে ফটিকছড়ি থেকে মানিকছড়ির যোগ্যাছলা পর্যন্ত এলাকায় বেশি বালু উত্তোলনের চিত্র পাওয়া গেছে।
গবেষণায় ১৩টি পানি দূষণ, ১০টি বায়ুদূষণ, ১১টি মাটিদূষণ, চারটি শব্দদূষণ, চারটি তাপীয় দূষণ, পাঁচটি ধুলিদূষণ, ছয়টি ভারী ধাতুদূষণ ও তিনটি প্লাস্টিক দূষণের উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিক্ষয়ের একটি উৎস চিহ্নিত হয়েছে। মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড ও পরিবেশগত কারণেও নদীটির বিভিন্ন ধরনের দূষণ ঘটছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
গবেষণাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হালদার দুই পাড়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্য, ঔষধি ও দুর্লভ উদ্ভিদ এবং বিপন্ন প্রজাতি শনাক্ত করা। পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ের মাটি সুরক্ষায় উদ্ভিদের ভূমিকা নিরূপণ এবং বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল)। সহযোগী নেতৃত্বে ছিলেন ইকোর সায়েন্টিফিক অফিসার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী মো. খন্দকার রাজিউর রহমান, সজীব রুদ্র, মো. আরিফ হোসাইন, মো. শহিদুল ইসলাম, টুকি মারমা ও সনাতন চন্দ্র বর্মন।
গবেষণার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি এবং মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন।
বিডি প্রতিদিন/এম.এস

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামের হালদা নদীর দুই পাড়ে ২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ ইতোমধ্যে বিপন্ন তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে আরও শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ অদূর ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, হালদা নদীর দুই পাড়ে মোট ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদ ৫৮৭টি গণ ও ১৫২টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। শনাক্ত করা উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে ২১২ প্রজাতির বড় বৃক্ষ, ১৩৩ প্রজাতির গুল্ম, ১৩৩ প্রজাতির লতা, ৫২২ প্রজাতির বীরুৎ এবং ৯ প্রজাতির পরজীবী উদ্ভিদ।
বিপন্ন ২৩ প্রজাতির উদ্ভিদের তালিকায় রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন বা লেকুয়া গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, নেরা মিলাতি, পাখা ঢেকিয়া, বনিপদ, মাইল্লা আম, পানিজাম ও চালমুগড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতি। অন্যদিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে বনিপদ, নীলভুট্টা, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুর্চি পাম, নাট অলকুশি, খনা, অশোক, বরুণ ও লবঙ্গ লতাসহ আরও অন্তত ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন হতে পারে।
গবেষণায় শনাক্ত করা উদ্ভিদের মধ্যে স্থানীয় প্রজাতি ৭৬৫টি এবং বিদেশি প্রজাতি ২৪৪টি। এ ছাড়া একবীজপত্রী ২২৩টি ও দ্বিবীজপত্রী ৭৪৯টি প্রজাতি পাওয়া গেছে। শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে দুটি নগ্নবীজি উদ্ভিদ, ১৩টি মসগোত্রীয় এবং ৩৫টি ফার্ন প্রজাতিও রয়েছে। পাশাপাশি সাত প্রজাতির ছত্রাক শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষণায় হালদা নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও উঠে এসেছে। সাধারণত উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে জন্মানো কেওড়া গাছের উপস্থিতি কর্ণফুলীর মোহনা মদুনাঘাট থেকে হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, উজানের দিকে কেওড়া গাছের বিস্তৃতি নদীর পানিতে লবণাক্ততার আধিক্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, যা নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি হতে পারে।
এ ছাড়া নদী দূষণ ও পরিবেশগত ক্ষতির উৎসও চিহ্নিত করা হয়েছে গবেষণায়। অধিকাংশ দূষণের উৎস মদুনাঘাট থেকে নাজিরহাট সেতু পর্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে ফটিকছড়ি থেকে মানিকছড়ির যোগ্যাছলা পর্যন্ত এলাকায় বেশি বালু উত্তোলনের চিত্র পাওয়া গেছে।
গবেষণায় ১৩টি পানি দূষণ, ১০টি বায়ুদূষণ, ১১টি মাটিদূষণ, চারটি শব্দদূষণ, চারটি তাপীয় দূষণ, পাঁচটি ধুলিদূষণ, ছয়টি ভারী ধাতুদূষণ ও তিনটি প্লাস্টিক দূষণের উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিক্ষয়ের একটি উৎস চিহ্নিত হয়েছে। মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড ও পরিবেশগত কারণেও নদীটির বিভিন্ন ধরনের দূষণ ঘটছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
গবেষণাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হালদার দুই পাড়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্য, ঔষধি ও দুর্লভ উদ্ভিদ এবং বিপন্ন প্রজাতি শনাক্ত করা। পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ের মাটি সুরক্ষায় উদ্ভিদের ভূমিকা নিরূপণ এবং বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল)। সহযোগী নেতৃত্বে ছিলেন ইকোর সায়েন্টিফিক অফিসার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী মো. খন্দকার রাজিউর রহমান, সজীব রুদ্র, মো. আরিফ হোসাইন, মো. শহিদুল ইসলাম, টুকি মারমা ও সনাতন চন্দ্র বর্মন।
গবেষণার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি এবং মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন।
বিডি প্রতিদিন/এম.এস
