বেইলি রোডে একটা ছোট্ট কফিশপ। সকালবেলা সেখানে বসে থাকি আমি—একটা আমেরিকানো অর্ডার করে ঢুকে পড়ি স্মোকিং জোনে। ছোট্ট একটা ঘর, জানালাহীন, আর তামাকের গন্ধে পূর্ণ। মেয়েদের জন্য এই শহরে ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস নেওয়াও যেন একটা সাহসের কাজ, তাই এখানে ভিড় বেশি হয় কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের।
আজও তেমনই এক সকাল। কিন্তু আজকের সকালটা আলাদা করে মনে রয়ে যাবে।
একটা মেয়ে এসেছিল। বয়স হবে কুড়ি-বাইশ। চুলগুলো খোলা, কানে সারি সারি দুল। সিগারেট ধরিয়ে একের পর এক টান দিচ্ছে। লাকি স্ট্রাইক। যেন প্রত্যেকটা টানেই সে নিজের ভিতরটা খুঁজে ফিরছে।
হাতে ফোন, চোখেও। কিন্তু অস্থিরতা নেই। সে অপেক্ষা করছে না কারও জন্য। বরং সময়টা কাটিয়ে দিচ্ছে নিজের মতো করে।
আমি একটু কৌশলে সরে বসলাম, যাতে তার ফোন দেখা যায়। হ্যাঁ, এটা একটা খারাপ অভ্যাস। কিন্তু আমি লেখক, আমার পাপের নাম—পর্যবেক্ষণ।
সে ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করছিল। প্রথমে এক কুকুর, নাচছে, লেজ নাড়ছে—একটা বড় হার্ট রিঅ্যাক্ট দিলো।
আমার বুকের ভেতরে একটা ঈর্ষার ঝাঁজ। শুধু কুকুরটা হতে পারলেই হতো!
তারপর এলো এক লিপস্টিক লাগানো মেয়ে, রিঅ্যাক্ট দিলো না।
তারপর গাছ, নদী, পাখি—সবাইকে ভালোবাসা দিলো। যেন সে প্রকৃতির সাথেই আত্মীয়তা গড়ে তুলেছে।
আমি কফিতে চুমুক দিই, সিগারেট ধরাই। মনে হয় বুকের ভেতরে তিনটে নদী বইছে—ঈর্ষা, হতাশা আর লোভ।
এই মেয়েটা গল্পের কোনো চরিত্র নয়, সে নিজেই এক গল্প। এমন এক গল্প, যেখানে প্রেম নেই, তবু প্রেমের অভাবটাও একটা অনুভব হয়ে থেকে যায়।
বাইরে আকাশ কালো হয়ে এসেছে। একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি নামবে। আমি হয়তো আরেকটা সিগারেট ধরাবো, আর মনে মনে সেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবো—
তুমি কি জানো, তুমি কোনো গল্পে ঢুকে গিয়েছো?
তিনদিন কেটে গেছে। আমি প্রতিদিনই গিয়েছি সেই কফিশপে, ঠিক আগের মতো, আমেরিকানো অর্ডার করে সেই স্মোকিং জোনে ঢুকেছি—কিন্তু সে আসেনি।
বাইরে বৃষ্টি কমে এসেছে, রোদ উঠেছে, কিন্তু আমার ভিতরের মেঘ আজও জমে আছে।
চতুর্থ দিনে, দুপুরের একটু আগে, আমি যখন সিগারেটে শেষ টান দিচ্ছি, তখন দেখি দরজাটা খোলা হলো। মেয়েটা ঢুকলো, যেন সে প্রতিদিনই আসছে—আর আজকেও এসে গেছে।
চুল বাঁধা এবার, নীল-সাদা টি-শার্ট আর ডেনিম।
সে আজও ফোনে তাকিয়ে, তবে এবার মাঝে মাঝে আশেপাশে নজর দিচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়লো।
আমি কিছুটা অবাক, কিছুটা ভেতরে খুশি। শুধু মাথা নেড়ে জবাব দিলাম।
সে এবার পাশের টেবিলে এসে বসলো।
— আপনি প্রতিদিন আসেন, তাই না?
আমি একটু থেমে বললাম, — হুম, অভ্যাস হয়ে গেছে।
— আমি শুধু শনিবার আসি। অন্য দিন ক্লাস, কাজ, রান্না সব কিছুতেই ডুবে থাকি।
— আপনার ফোনে যে ভিডিওগুলো দেখছিলেন... সেদিন, কুকুর, গাছ, নদী—সব কিছু ভালোবাসা পাচ্ছিল।
সে হেসে ফেললো। — আপনি তো খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন, লেখক না কি?
আমি একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বললাম, — হয়তো। না হয় গল্পের খোরাক খুঁজছিলাম।
সে এবার চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, — আচ্ছা, আপনি যদি কোনো গল্প লিখেন আমার মতো কাউকে নিয়ে—তাহলে আমাকে পড়তে দিবেন?
আমি বললাম, — শুধু পড়া না, চাইলে গল্পটার শেষে আপনি নিজের নামও বসাতে পারবেন।
সে হেসে ফেললো—এই হাসি, এই মুহূর্ত—সব কফির ধোঁয়ার ভেতরে লুকিয়ে রইলো, একটুখানি আগুন রেখে গেলো কোনো অজানা সকালেও।
স্মোকিং জোনটা আজ যেন একটু বড় মনে হলো।
আজ শনিবার। আবার সেই কফিশপে ফিরে আসার দিন।
সে এসেছে।
আমি এসেছি।
একই সময়ে।
সে আজও স্মোকিং জোনে ঢুকলো, কিন্তু এবার আমার টেবিলে এসে বসল। বললো, — আজ আপনাকে একটা গল্প শোনাবো। শুনবেন?
আমি মাথা নাড়লাম। সে চোখ সরিয়ে জানালার পাশে তাকিয়ে বললো,
— একটা মেয়ের গল্প, যে প্রতিদিন হাসে, ইনস্টাগ্রামে রিঅ্যাক্ট দেয়, কিন্তু তার ভিতরে একটা শূন্যতা থাকে। সেই শূন্যতা সে ভরাতে চায় কুকুরের ভিডিও দিয়ে, নদীর নীরবতায়, কিংবা কারো অচেনা চোখে।
আমি বললাম, — তারপর?
সে বললো, — তারপর একদিন সে দেখে, কেউ তাকে দেখছে। গল্পের ভেতরে তুলে রাখছে। সেই প্রথম সে নিজেকে আস্ত মনে করে। না শুধু লাইক বা হেডফোনের আওয়াজে নয়—কারো চোখে।
আমি হাসি চেপে বললাম, — তুমি কি সেই মেয়ে?
সে বললো, — আমি তো কেবল গল্প বলছি। বাকি ব্যাখ্যা আপনার।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে না। আজকে আকাশ পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের চুপচাপ কথার ভেতরে যে অনুভব, সেটা কফির কাপ পেরিয়ে মনের ভিতর জমে আছে।
আমি বললাম, — চলো, আজ আমরা ইনস্টাগ্রাম ছাড়াই হাঁটি—নদীর দিকে, প্রকৃতির দিকে। কোনো গল্প ছাড়াই।
সে হাসলো। বললো, — চলুন।
আমরা দুজন স্মোকিং জোন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম—একটা অচেনা গল্পের দিকে, যেটার নাম এখনো কেউ রাখেনি।
✍️ নাহিদ হোসেন

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
বেইলি রোডে একটা ছোট্ট কফিশপ। সকালবেলা সেখানে বসে থাকি আমি—একটা আমেরিকানো অর্ডার করে ঢুকে পড়ি স্মোকিং জোনে। ছোট্ট একটা ঘর, জানালাহীন, আর তামাকের গন্ধে পূর্ণ। মেয়েদের জন্য এই শহরে ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস নেওয়াও যেন একটা সাহসের কাজ, তাই এখানে ভিড় বেশি হয় কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের।
আজও তেমনই এক সকাল। কিন্তু আজকের সকালটা আলাদা করে মনে রয়ে যাবে।
একটা মেয়ে এসেছিল। বয়স হবে কুড়ি-বাইশ। চুলগুলো খোলা, কানে সারি সারি দুল। সিগারেট ধরিয়ে একের পর এক টান দিচ্ছে। লাকি স্ট্রাইক। যেন প্রত্যেকটা টানেই সে নিজের ভিতরটা খুঁজে ফিরছে।
হাতে ফোন, চোখেও। কিন্তু অস্থিরতা নেই। সে অপেক্ষা করছে না কারও জন্য। বরং সময়টা কাটিয়ে দিচ্ছে নিজের মতো করে।
আমি একটু কৌশলে সরে বসলাম, যাতে তার ফোন দেখা যায়। হ্যাঁ, এটা একটা খারাপ অভ্যাস। কিন্তু আমি লেখক, আমার পাপের নাম—পর্যবেক্ষণ।
সে ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করছিল। প্রথমে এক কুকুর, নাচছে, লেজ নাড়ছে—একটা বড় হার্ট রিঅ্যাক্ট দিলো।
আমার বুকের ভেতরে একটা ঈর্ষার ঝাঁজ। শুধু কুকুরটা হতে পারলেই হতো!
তারপর এলো এক লিপস্টিক লাগানো মেয়ে, রিঅ্যাক্ট দিলো না।
তারপর গাছ, নদী, পাখি—সবাইকে ভালোবাসা দিলো। যেন সে প্রকৃতির সাথেই আত্মীয়তা গড়ে তুলেছে।
আমি কফিতে চুমুক দিই, সিগারেট ধরাই। মনে হয় বুকের ভেতরে তিনটে নদী বইছে—ঈর্ষা, হতাশা আর লোভ।
এই মেয়েটা গল্পের কোনো চরিত্র নয়, সে নিজেই এক গল্প। এমন এক গল্প, যেখানে প্রেম নেই, তবু প্রেমের অভাবটাও একটা অনুভব হয়ে থেকে যায়।
বাইরে আকাশ কালো হয়ে এসেছে। একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি নামবে। আমি হয়তো আরেকটা সিগারেট ধরাবো, আর মনে মনে সেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবো—
তুমি কি জানো, তুমি কোনো গল্পে ঢুকে গিয়েছো?
তিনদিন কেটে গেছে। আমি প্রতিদিনই গিয়েছি সেই কফিশপে, ঠিক আগের মতো, আমেরিকানো অর্ডার করে সেই স্মোকিং জোনে ঢুকেছি—কিন্তু সে আসেনি।
বাইরে বৃষ্টি কমে এসেছে, রোদ উঠেছে, কিন্তু আমার ভিতরের মেঘ আজও জমে আছে।
চতুর্থ দিনে, দুপুরের একটু আগে, আমি যখন সিগারেটে শেষ টান দিচ্ছি, তখন দেখি দরজাটা খোলা হলো। মেয়েটা ঢুকলো, যেন সে প্রতিদিনই আসছে—আর আজকেও এসে গেছে।
চুল বাঁধা এবার, নীল-সাদা টি-শার্ট আর ডেনিম।
সে আজও ফোনে তাকিয়ে, তবে এবার মাঝে মাঝে আশেপাশে নজর দিচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়লো।
আমি কিছুটা অবাক, কিছুটা ভেতরে খুশি। শুধু মাথা নেড়ে জবাব দিলাম।
সে এবার পাশের টেবিলে এসে বসলো।
— আপনি প্রতিদিন আসেন, তাই না?
আমি একটু থেমে বললাম, — হুম, অভ্যাস হয়ে গেছে।
— আমি শুধু শনিবার আসি। অন্য দিন ক্লাস, কাজ, রান্না সব কিছুতেই ডুবে থাকি।
— আপনার ফোনে যে ভিডিওগুলো দেখছিলেন... সেদিন, কুকুর, গাছ, নদী—সব কিছু ভালোবাসা পাচ্ছিল।
সে হেসে ফেললো। — আপনি তো খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন, লেখক না কি?
আমি একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বললাম, — হয়তো। না হয় গল্পের খোরাক খুঁজছিলাম।
সে এবার চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, — আচ্ছা, আপনি যদি কোনো গল্প লিখেন আমার মতো কাউকে নিয়ে—তাহলে আমাকে পড়তে দিবেন?
আমি বললাম, — শুধু পড়া না, চাইলে গল্পটার শেষে আপনি নিজের নামও বসাতে পারবেন।
সে হেসে ফেললো—এই হাসি, এই মুহূর্ত—সব কফির ধোঁয়ার ভেতরে লুকিয়ে রইলো, একটুখানি আগুন রেখে গেলো কোনো অজানা সকালেও।
স্মোকিং জোনটা আজ যেন একটু বড় মনে হলো।
আজ শনিবার। আবার সেই কফিশপে ফিরে আসার দিন।
সে এসেছে।
আমি এসেছি।
একই সময়ে।
সে আজও স্মোকিং জোনে ঢুকলো, কিন্তু এবার আমার টেবিলে এসে বসল। বললো, — আজ আপনাকে একটা গল্প শোনাবো। শুনবেন?
আমি মাথা নাড়লাম। সে চোখ সরিয়ে জানালার পাশে তাকিয়ে বললো,
— একটা মেয়ের গল্প, যে প্রতিদিন হাসে, ইনস্টাগ্রামে রিঅ্যাক্ট দেয়, কিন্তু তার ভিতরে একটা শূন্যতা থাকে। সেই শূন্যতা সে ভরাতে চায় কুকুরের ভিডিও দিয়ে, নদীর নীরবতায়, কিংবা কারো অচেনা চোখে।
আমি বললাম, — তারপর?
সে বললো, — তারপর একদিন সে দেখে, কেউ তাকে দেখছে। গল্পের ভেতরে তুলে রাখছে। সেই প্রথম সে নিজেকে আস্ত মনে করে। না শুধু লাইক বা হেডফোনের আওয়াজে নয়—কারো চোখে।
আমি হাসি চেপে বললাম, — তুমি কি সেই মেয়ে?
সে বললো, — আমি তো কেবল গল্প বলছি। বাকি ব্যাখ্যা আপনার।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে না। আজকে আকাশ পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের চুপচাপ কথার ভেতরে যে অনুভব, সেটা কফির কাপ পেরিয়ে মনের ভিতর জমে আছে।
আমি বললাম, — চলো, আজ আমরা ইনস্টাগ্রাম ছাড়াই হাঁটি—নদীর দিকে, প্রকৃতির দিকে। কোনো গল্প ছাড়াই।
সে হাসলো। বললো, — চলুন।
আমরা দুজন স্মোকিং জোন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম—একটা অচেনা গল্পের দিকে, যেটার নাম এখনো কেউ রাখেনি।
✍️ নাহিদ হোসেন

আপনার মতামত লিখুন