কেউ বলে, রাশেদরে আমি ছোটবেলা থেইকা চিনি। এক লগে স্কুলে গেছি।
কেউ বলে, ওই যে টিভিতে দেখায়, বড় বড় মঞ্চে বক্তৃতা দেয়, সেইডা আমাদের রাশেদ!
আর কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মানুষের কপালও কেমন বদলায় রে ভাই!
সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে এলে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে এসব কথাই চলে।
কিন্তু কেউ জানে না, সেই রাশেদের গল্পের শুরুটা কতটা ধুলো, কষ্ট আর অভাবের মধ্যে ছিল।
রাশেদের বাবা করিম উদ্দিন ছিলেন দিনমজুর।
নিজের বলতে এক টুকরো জমিও ছিল না।
সকালে কাজ থাকলে ভাত জুটত, না থাকলে আলু সেদ্ধ দিয়ে দিন কাটত।
তবু করিম উদ্দিনের একটা স্বপ্ন ছিল—
আমার ছেইলিডা লেখাপড়া শিখবে।
গ্রামের মানুষ হাসত।
গরিবের পোলা আবার বড় মানুষ হইবো?
করিম উত্তর দিত না।
শুধু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলত,
তুই পড়। আল্লাহ বড়।
রাশেদ স্কুলে ভালো ছাত্র ছিল।
কিন্তু ভালো ছাত্র হলেই তো হয় না।
বই লাগে।
খাতা লাগে।
কলেজে ভর্তি হতে টাকা লাগে।
একদিন রাশেদের মা তার বিয়ের সময় পাওয়া শেষ সোনার কানের দুল খুলে স্বামীর হাতে দিয়ে বলেছিলেন,
বেইচা দাও। ছেইলিডারে পড়াও।
সেদিন রাতে রাশেদ মায়ের কান দুটো অনেকক্ষণ দেখেছিল।
খালি কানের লতি যেন তাকে সারাজীবনের জন্য ঋণী করে দিয়েছিল।
জেলা শহরের কলেজে ভর্তি হলো রাশেদ।
মেসে থাকত।
এক রুমে চারজন।
গরমে ঘুম হতো না।
শীতে কম্বল ছিল না।
বন্ধুদের হাতে স্মার্টফোন দেখে বুকের ভেতর হাহাকার উঠত।
কিন্তু বাবাকে কখনও বলেনি।
জানত, বাবার পকেটে স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নেই।
কলেজ শেষ হওয়ার পর শুরু হলো চাকরির যুদ্ধ।
একটার পর একটা পরীক্ষা।
একটার পর একটা ব্যর্থতা।
কখনও রেলের চাকরি হলো না।
কখনও ব্যাংকের তালিকায় নাম এল না।
কখনও ভাইভা পর্যন্ত গিয়েও ফিরে আসতে হলো।
গ্রামের মানুষ ফিসফিস শুরু করল।
এত পড়ালেখা কইরা লাভ কী?
দিনমজুরের পোলা দিনমজুরই থাকে।
সেই সময় রাশেদ প্রায় ভেঙে পড়েছিল।
এক রাতে মায়ের পাশে বসে বলেছিল,
আমারে দিয়া হইবো না মা।
মা চুপ করে ছিলেন।
তারপর শুধু বলেছিলেন,
মানুষ হইতে গেলে অনেকবার হারতে হয় বাবা।
সেদিন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
পরে বুঝেছিল, এটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বছর তিনেক পর এক সকালে ফোন এলো।
রাশেদ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি।
তার চাকরি হয়েছে।
সরকারি চাকরি।
নিজের যোগ্যতায়।
নিজের পরিশ্রমে।
নিজের লড়াইয়ে।
সেদিন করিম উদ্দিন কাঁদছিলেন।
একজন বৃদ্ধ মানুষ।
যিনি জীবনে কখনও প্রকাশ্যে চোখের পানি ফেলেননি।
তিনি শুধু বলছিলেন,
আমার ছেইলিডা পারছে—
অনেক বছর পর রাশেদ গ্রামের বাড়ি ফিরল।
সামনে গাড়ি।
পিছনে সম্মান।
মানুষের ভিড়।
হাত মেলাতে চায় সবাই।
ছবি তুলতে চায় সবাই।
যারা একসময় বলত—
গরিবের পোলা বড় মানুষ হইবো না—
তারাই আজ গর্ব করে বলে,
রাশেদ আমাদের গ্রামের ছেলে।
ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাশেদের চোখ হঠাৎ একজন বৃদ্ধকে খুঁজতে থাকে।
বাবা নেই।
মা-ও নেই।
দুজনেই অনেক আগেই চলে গেছেন।
সবচেয়ে বড় অর্জন—
একদিন যে মায়ের খালি কানের লতি দেখে সে কেঁদেছিল,
আজ সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখতে পেরেছে।
সন্ধ্যার আলো নামছে।
গ্রামের রাস্তা দিয়ে হালকা ধুলো উড়ছে।
রাশেদ দাঁড়িয়ে থাকে।
চোখের কোণে জল জমে।
সে মনে মনে বলে—
মানুষ বড় হয় পদবি দিয়ে না,
মানুষ বড় হয় তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে।
ধুলোর ওপারে তখনও যেন সে দেখতে পায়—
একজন দিনমজুর বাবা,
একজন ত্যাগী মা,
আর খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া ছোট্ট এক ছেলেকে।
সেই ছেলেটার নাম—
রাশেদ।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
কেউ বলে, রাশেদরে আমি ছোটবেলা থেইকা চিনি। এক লগে স্কুলে গেছি।
কেউ বলে, ওই যে টিভিতে দেখায়, বড় বড় মঞ্চে বক্তৃতা দেয়, সেইডা আমাদের রাশেদ!
আর কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মানুষের কপালও কেমন বদলায় রে ভাই!
সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে এলে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে এসব কথাই চলে।
কিন্তু কেউ জানে না, সেই রাশেদের গল্পের শুরুটা কতটা ধুলো, কষ্ট আর অভাবের মধ্যে ছিল।
রাশেদের বাবা করিম উদ্দিন ছিলেন দিনমজুর।
নিজের বলতে এক টুকরো জমিও ছিল না।
সকালে কাজ থাকলে ভাত জুটত, না থাকলে আলু সেদ্ধ দিয়ে দিন কাটত।
তবু করিম উদ্দিনের একটা স্বপ্ন ছিল—
আমার ছেইলিডা লেখাপড়া শিখবে।
গ্রামের মানুষ হাসত।
গরিবের পোলা আবার বড় মানুষ হইবো?
করিম উত্তর দিত না।
শুধু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলত,
তুই পড়। আল্লাহ বড়।
রাশেদ স্কুলে ভালো ছাত্র ছিল।
কিন্তু ভালো ছাত্র হলেই তো হয় না।
বই লাগে।
খাতা লাগে।
কলেজে ভর্তি হতে টাকা লাগে।
একদিন রাশেদের মা তার বিয়ের সময় পাওয়া শেষ সোনার কানের দুল খুলে স্বামীর হাতে দিয়ে বলেছিলেন,
বেইচা দাও। ছেইলিডারে পড়াও।
সেদিন রাতে রাশেদ মায়ের কান দুটো অনেকক্ষণ দেখেছিল।
খালি কানের লতি যেন তাকে সারাজীবনের জন্য ঋণী করে দিয়েছিল।
জেলা শহরের কলেজে ভর্তি হলো রাশেদ।
মেসে থাকত।
এক রুমে চারজন।
গরমে ঘুম হতো না।
শীতে কম্বল ছিল না।
বন্ধুদের হাতে স্মার্টফোন দেখে বুকের ভেতর হাহাকার উঠত।
কিন্তু বাবাকে কখনও বলেনি।
জানত, বাবার পকেটে স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নেই।
কলেজ শেষ হওয়ার পর শুরু হলো চাকরির যুদ্ধ।
একটার পর একটা পরীক্ষা।
একটার পর একটা ব্যর্থতা।
কখনও রেলের চাকরি হলো না।
কখনও ব্যাংকের তালিকায় নাম এল না।
কখনও ভাইভা পর্যন্ত গিয়েও ফিরে আসতে হলো।
গ্রামের মানুষ ফিসফিস শুরু করল।
এত পড়ালেখা কইরা লাভ কী?
দিনমজুরের পোলা দিনমজুরই থাকে।
সেই সময় রাশেদ প্রায় ভেঙে পড়েছিল।
এক রাতে মায়ের পাশে বসে বলেছিল,
আমারে দিয়া হইবো না মা।
মা চুপ করে ছিলেন।
তারপর শুধু বলেছিলেন,
মানুষ হইতে গেলে অনেকবার হারতে হয় বাবা।
সেদিন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
পরে বুঝেছিল, এটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বছর তিনেক পর এক সকালে ফোন এলো।
রাশেদ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি।
তার চাকরি হয়েছে।
সরকারি চাকরি।
নিজের যোগ্যতায়।
নিজের পরিশ্রমে।
নিজের লড়াইয়ে।
সেদিন করিম উদ্দিন কাঁদছিলেন।
একজন বৃদ্ধ মানুষ।
যিনি জীবনে কখনও প্রকাশ্যে চোখের পানি ফেলেননি।
তিনি শুধু বলছিলেন,
আমার ছেইলিডা পারছে—
অনেক বছর পর রাশেদ গ্রামের বাড়ি ফিরল।
সামনে গাড়ি।
পিছনে সম্মান।
মানুষের ভিড়।
হাত মেলাতে চায় সবাই।
ছবি তুলতে চায় সবাই।
যারা একসময় বলত—
গরিবের পোলা বড় মানুষ হইবো না—
তারাই আজ গর্ব করে বলে,
রাশেদ আমাদের গ্রামের ছেলে।
ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাশেদের চোখ হঠাৎ একজন বৃদ্ধকে খুঁজতে থাকে।
বাবা নেই।
মা-ও নেই।
দুজনেই অনেক আগেই চলে গেছেন।
সবচেয়ে বড় অর্জন—
একদিন যে মায়ের খালি কানের লতি দেখে সে কেঁদেছিল,
আজ সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখতে পেরেছে।
সন্ধ্যার আলো নামছে।
গ্রামের রাস্তা দিয়ে হালকা ধুলো উড়ছে।
রাশেদ দাঁড়িয়ে থাকে।
চোখের কোণে জল জমে।
সে মনে মনে বলে—
মানুষ বড় হয় পদবি দিয়ে না,
মানুষ বড় হয় তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে।
ধুলোর ওপারে তখনও যেন সে দেখতে পায়—
একজন দিনমজুর বাবা,
একজন ত্যাগী মা,
আর খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া ছোট্ট এক ছেলেকে।
সেই ছেলেটার নাম—
রাশেদ।

আপনার মতামত লিখুন