মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

গল্প

যেখানে দেখা হওয়ার কথা ছিল

যেখানে দেখা হওয়ার কথা ছিল
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

বিকেলের শেষ আলোটা এসে পড়েছে পুরোনো রেলস্টেশনের পাশের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডটায়। আলোটা যেন ক্লান্ত। বহু বছর ধরে একই বেঞ্চ, একই টিনের ছাউনি, একই ভাঙা সাইনবোর্ড দেখে দেখে সে বুঝে গেছে, এখানে আর কেউ অপেক্ষা করে না।

তবু একজন অপেক্ষা করছে।

অয়ন।

৩৫ বছরের এক যুবক।

পাশে ছোট্ট একটা ব্যাগ ,উস্কোখুস্কো চুল।

সে বসে আছে।

কারণ ১৫ বছর আগে একজন বলেছিল—

যদি কখনো হারিয়ে যাই, যদি আর কোথাও খুঁজে না পাও, তাহলে এখানে এসো। আমি অপেক্ষা করব।

মেয়েটার নাম ছিল মেঘলা।


তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

শহরের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি ছিল না মেঘলা।

কিন্তু অয়নের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ ছিল সে।

কারণ মেঘলা হাসলে মনে হতো খুব দূরে কোথাও বৃষ্টি নামছে।

আর সেই বৃষ্টির শব্দ কেবল অয়নই শুনতে পায়।


তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল এই বাসস্ট্যান্ডেই।

মেঘলা ভুল বাসে উঠে গিয়েছিল।

অয়ন তাকে নামিয়ে দিয়েছিল।

তারপর চা।

তারপর গল্প।

তারপর বন্ধুত্ব।

তারপর একদিন অজান্তেই প্রেম।


এক বিকেলে মেঘলা বলেছিল,

জানো, মানুষ হারিয়ে যায় কেন?

অয়ন হেসে বলেছিল,

খুঁজে পাওয়ার জন্য।

মেঘলা দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

তারপর বলেছিল,

আমি যদি হারিয়ে যাই?

আমি খুঁজে বের করব।

আর যদি না পারো?

তাহলে?

এই বাসস্ট্যান্ডে চলে এসো। দেখা হবে।

অয়ন হেসেছিল।

মেঘলা হাসেনি।

আজ এত বছর পরে সে বুঝতে পারে, মেয়েটা সেদিন সত্যি বলেছিল।


তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু জীবন মানুষের পরিকল্পনা শুনে হাসে।

মেঘলার বাবা বদলি হয়ে গেলেন অন্য শহরে।

দূরত্ব এল।

চিঠি এল।

উত্তর এল।

তারপর ধীরে ধীরে চিঠি কমে গেল।

জীবন বড় হয়ে উঠল।

সময় আরও বড়।

একদিন চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল।


অয়ন অনেক খুঁজেছিল।

পুরোনো ঠিকানা।

পুরোনো বন্ধু।

পরিচিত মানুষ।

কেউ বলতে পারেনি মেঘলা কোথায়।

মনে হয়েছিল মেয়েটা যেন পৃথিবী থেকে মুছে গেছে।


আজ হঠাৎ কেন যেন তার মনে হলো এখানে আসতে হবে।

কেউ ডাকেনি।

কোনো ফোন আসেনি।

তবু বুকের ভেতর একটা অনুভূতি সকাল থেকে বলছিল—

যাও।

আজ যাও।


সন্ধ্যা নামতে থাকে।

মানুষ আসে।

মানুষ যায়।

একজন কলেজছাত্রী এসে বসে।

তার হাসিতে এক মুহূর্তের জন্য মেঘলার ছায়া দেখতে পায় অয়ন।

ভুল হয়।

একজন মধ্যবয়সী নারী আসে।

তার চোখে পরিচিত বিষণ্ণতা।

ভুল হয়।

তার মুখে সময়ের ক্লান্তি।

তবু সে মেঘলা নয়।


আকাশ অন্ধকার হয়ে গেলে অয়ন প্রায় উঠে দাঁড়িয়েছিল।

ভাবছিল, আজও কিছু হবে না।

ঠিক তখনই একটা মেয়ে এসে বসে।

বয়স ১৫ কি ১৬ ।

হাতে ছোট্ট একটা খাম।

সে কিছু বলে না।

কেবল খামটা বেঞ্চে রেখে উঠে চলে যায়।


অয়ন বিস্মিত হয়ে খামটা তুলে নেয়।

খামের ওপর তার নাম লেখা।

শুধু—

অয়ন

কাঁপা হাতে খাম খুলে।

ভেতরে ভাঁজ করা একটা চিঠি।


প্রথম লাইনটা পড়েই তার বুক থেমে যেতে চায়।

অয়ন,

জানি তুমি একদিন এখানে আসবে।

হাত কাঁপতে থাকে তার।

চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।

এটা মেঘলার হাতের লেখা।

একটুও বদলায়নি।


চিঠিতে লেখা—

অনেক খুঁজেছি তোমাকে।

পাইনি।

জীবন আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।

বিয়ে করিনি।

তোমাকে ভুলতেও পারিনি।

গত বছর অসুস্থ হওয়ার পর বুঝলাম সময় খুব বেশি নেই।

তখন ভাইয়ের মেয়েকে তোমার গল্প বলেছি।

বলেছি, যদি কোনোদিন অয়ন আসে, তাকে এই চিঠিটা দিবে।

আমি অপেক্ষা করতে পারলাম না।

কিন্তু কথা রাখতে চেয়েছি।

তুমি যদি আসো, জেনে নিও—

পৃথিবীতে একজন মানুষ ছিল, যে শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে ভালোবেসেছে।


এরপর আর পড়তে পারে না অয়ন।

চোখ ভিজে যায়।

বহু বছরের জমে থাকা নীরবতা গলে পড়তে থাকে।


হঠাৎ তার মনে হয়, সে একা নয়।

একেবারেই একা নয়।

মেঘলা নেই।

তবু আছে।

এই বাতাসে।

এই বেঞ্চে।

এই অপেক্ষায়।

এই কাগজের ভাঁজে।


রাত নেমে আসে।

পুরোনো বাসস্ট্যান্ডটা অন্ধকারে ঢেকে যায়।

অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে।

তারপর একবার আকাশের দিকে তাকায়।

মনে হয়, খুব কাছ থেকে কেউ হাসছে।

সেই পুরোনো হাসি।

বৃষ্টির মতো নরম।


বাসস্ট্যান্ডের পাশে কৃষ্ণচূড়ার গাছটা হালকা বাতাসে দুলে ওঠে।

একটা শুকনো ফুল ঝরে পড়ে অয়নের পায়ের কাছে।

সে ফুলটা তুলে নেয়।

মৃদু হেসে বলে,

এত দেরি করলে কেন, মেঘলা?

কোনো উত্তর আসে না।

তবু তার মনে হয়, এসেছে।

কারণ কিছু ভালোবাসা মানুষের সঙ্গে বেঁচে থাকে না।

মানুষের পরেও বেঁচে থাকে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


যেখানে দেখা হওয়ার কথা ছিল

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

featured Image

বিকেলের শেষ আলোটা এসে পড়েছে পুরোনো রেলস্টেশনের পাশের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডটায়। আলোটা যেন ক্লান্ত। বহু বছর ধরে একই বেঞ্চ, একই টিনের ছাউনি, একই ভাঙা সাইনবোর্ড দেখে দেখে সে বুঝে গেছে, এখানে আর কেউ অপেক্ষা করে না।

তবু একজন অপেক্ষা করছে।

অয়ন।

৩৫ বছরের এক যুবক।

পাশে ছোট্ট একটা ব্যাগ ,উস্কোখুস্কো চুল।

সে বসে আছে।

কারণ ১৫ বছর আগে একজন বলেছিল—

যদি কখনো হারিয়ে যাই, যদি আর কোথাও খুঁজে না পাও, তাহলে এখানে এসো। আমি অপেক্ষা করব।

মেয়েটার নাম ছিল মেঘলা।


তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

শহরের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি ছিল না মেঘলা।

কিন্তু অয়নের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ ছিল সে।

কারণ মেঘলা হাসলে মনে হতো খুব দূরে কোথাও বৃষ্টি নামছে।

আর সেই বৃষ্টির শব্দ কেবল অয়নই শুনতে পায়।


তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল এই বাসস্ট্যান্ডেই।

মেঘলা ভুল বাসে উঠে গিয়েছিল।

অয়ন তাকে নামিয়ে দিয়েছিল।

তারপর চা।

তারপর গল্প।

তারপর বন্ধুত্ব।

তারপর একদিন অজান্তেই প্রেম।


এক বিকেলে মেঘলা বলেছিল,

জানো, মানুষ হারিয়ে যায় কেন?

অয়ন হেসে বলেছিল,

খুঁজে পাওয়ার জন্য।

মেঘলা দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

তারপর বলেছিল,

আমি যদি হারিয়ে যাই?

আমি খুঁজে বের করব।

আর যদি না পারো?

তাহলে?

এই বাসস্ট্যান্ডে চলে এসো। দেখা হবে।

অয়ন হেসেছিল।

মেঘলা হাসেনি।

আজ এত বছর পরে সে বুঝতে পারে, মেয়েটা সেদিন সত্যি বলেছিল।


তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু জীবন মানুষের পরিকল্পনা শুনে হাসে।

মেঘলার বাবা বদলি হয়ে গেলেন অন্য শহরে।

দূরত্ব এল।

চিঠি এল।

উত্তর এল।

তারপর ধীরে ধীরে চিঠি কমে গেল।

জীবন বড় হয়ে উঠল।

সময় আরও বড়।

একদিন চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল।


অয়ন অনেক খুঁজেছিল।

পুরোনো ঠিকানা।

পুরোনো বন্ধু।

পরিচিত মানুষ।

কেউ বলতে পারেনি মেঘলা কোথায়।

মনে হয়েছিল মেয়েটা যেন পৃথিবী থেকে মুছে গেছে।


আজ হঠাৎ কেন যেন তার মনে হলো এখানে আসতে হবে।

কেউ ডাকেনি।

কোনো ফোন আসেনি।

তবু বুকের ভেতর একটা অনুভূতি সকাল থেকে বলছিল—

যাও।

আজ যাও।


সন্ধ্যা নামতে থাকে।

মানুষ আসে।

মানুষ যায়।

একজন কলেজছাত্রী এসে বসে।

তার হাসিতে এক মুহূর্তের জন্য মেঘলার ছায়া দেখতে পায় অয়ন।

ভুল হয়।

একজন মধ্যবয়সী নারী আসে।

তার চোখে পরিচিত বিষণ্ণতা।

ভুল হয়।

তার মুখে সময়ের ক্লান্তি।

তবু সে মেঘলা নয়।


আকাশ অন্ধকার হয়ে গেলে অয়ন প্রায় উঠে দাঁড়িয়েছিল।

ভাবছিল, আজও কিছু হবে না।

ঠিক তখনই একটা মেয়ে এসে বসে।

বয়স ১৫ কি ১৬ ।

হাতে ছোট্ট একটা খাম।

সে কিছু বলে না।

কেবল খামটা বেঞ্চে রেখে উঠে চলে যায়।


অয়ন বিস্মিত হয়ে খামটা তুলে নেয়।

খামের ওপর তার নাম লেখা।

শুধু—

অয়ন

কাঁপা হাতে খাম খুলে।

ভেতরে ভাঁজ করা একটা চিঠি।


প্রথম লাইনটা পড়েই তার বুক থেমে যেতে চায়।

অয়ন,

জানি তুমি একদিন এখানে আসবে।

হাত কাঁপতে থাকে তার।

চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।

এটা মেঘলার হাতের লেখা।

একটুও বদলায়নি।


চিঠিতে লেখা—

অনেক খুঁজেছি তোমাকে।

পাইনি।

জীবন আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।

বিয়ে করিনি।

তোমাকে ভুলতেও পারিনি।

গত বছর অসুস্থ হওয়ার পর বুঝলাম সময় খুব বেশি নেই।

তখন ভাইয়ের মেয়েকে তোমার গল্প বলেছি।

বলেছি, যদি কোনোদিন অয়ন আসে, তাকে এই চিঠিটা দিবে।

আমি অপেক্ষা করতে পারলাম না।

কিন্তু কথা রাখতে চেয়েছি।

তুমি যদি আসো, জেনে নিও—

পৃথিবীতে একজন মানুষ ছিল, যে শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে ভালোবেসেছে।


এরপর আর পড়তে পারে না অয়ন।

চোখ ভিজে যায়।

বহু বছরের জমে থাকা নীরবতা গলে পড়তে থাকে।


হঠাৎ তার মনে হয়, সে একা নয়।

একেবারেই একা নয়।

মেঘলা নেই।

তবু আছে।

এই বাতাসে।

এই বেঞ্চে।

এই অপেক্ষায়।

এই কাগজের ভাঁজে।


রাত নেমে আসে।

পুরোনো বাসস্ট্যান্ডটা অন্ধকারে ঢেকে যায়।

অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে।

তারপর একবার আকাশের দিকে তাকায়।

মনে হয়, খুব কাছ থেকে কেউ হাসছে।

সেই পুরোনো হাসি।

বৃষ্টির মতো নরম।


বাসস্ট্যান্ডের পাশে কৃষ্ণচূড়ার গাছটা হালকা বাতাসে দুলে ওঠে।

একটা শুকনো ফুল ঝরে পড়ে অয়নের পায়ের কাছে।

সে ফুলটা তুলে নেয়।

মৃদু হেসে বলে,

এত দেরি করলে কেন, মেঘলা?

কোনো উত্তর আসে না।

তবু তার মনে হয়, এসেছে।

কারণ কিছু ভালোবাসা মানুষের সঙ্গে বেঁচে থাকে না।

মানুষের পরেও বেঁচে থাকে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো