মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

রম্যগল্প

কী রাগ করলা?

কী রাগ করলা?
ছবি : সংগৃহীত

আরিফ সাহেব গত দুই দিন ধরে চরম ডিপ্রেশনে আছেন। ফেসবুক স্ক্রল করলেই তার স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—কী রাগ করলা?। 

কমেন্ট বক্সে কেউ কাউকে পঁচিয়ে দিয়ে নিচে লিখে রাখছে—কী রাগ করলা?। এমনকি তার নিজের স্ত্রী রাবেয়া বেগম আজ সকালে তরকারিতে লবণ কম দিয়ে যখন বললেন, আজকে তরকারিতে নুন একটু কম হইছে, কী রাগ করলা?

—তখন আরিফ সাহেবের মনে হলো, এই ডায়ালগ আবিষ্কারককে সামনে পেলে তিনি জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলতেন!

তবে আরিফ সাহেবের আসল পরীক্ষাটা শুরু হলো আজ অফিসে যাওয়ার পর।

অফিসে ঢুকতেই দেখা গেল পিয়ন মন্টু মিয়া আজ চা দিতে আধা ঘণ্টা দেরি করেছে। আরিফ সাহেব চোখ গরম করে বলতেই মন্টু দাঁত কেলিয়ে বলল, স্যার, চিনি একটু বেশি পইড়া গেছে। কী রাগ করলেন?

আরিফ সাহেব ফাইলটা ছুঁড়ে মারতে গিয়েও নিজেকে সামলালেন। যুগটাই মিমের যুগ, রাগলে নিজেরই লস।

দুপুরে লাঞ্চের পর যখন আরিফ সাহেব একটু ঝিমোচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তার কিউবিকলে এসে হাজির হলেন খিটখিটে স্বভাবের বস মোজাম্মেল সাহেব। হাতে একটা মোটাসোটা ফাইলের স্তূপ।

বস ফাইলটা আরিফ সাহেবের টেবিলের ওপর ধপ করে ফেলে বললেন, আরিফ সাহেব, এই সাতাশটা রিপোর্টের ফরম্যাটিং একদম ঠিকঠাক হয়নি। আজ রাত দশটার মধ্যে পুরোটা রিকারেকশন করে ইমেইল করবেন।

আরিফ সাহেবের মাথায় তখন ৪৪টি ৪G ভোল্টের শক লাগল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, কিন্তু স্যার, আজ তো আমার বিবাহবার্ষিকী! সন্ধ্যায় ফ্যামিলি নিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল—


বস মোজাম্মেল সাহেব নিজের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে, রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বললেন, আজকে যেতে পারবেন না আরিফ সাহেব। কী রাগ করলেন?

আরিফ সাহেবের ইচ্ছে করছিল বসের চকচকে টাকটার ওপর ফাইলের সাতাশটা পৃষ্ঠা একে একে মারতে। কিন্তু চাকরি বাঁচানোর তাগিদে মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললেন, না স্যার, রাগ করব কেন? আমোদিত হলাম!

রাত সাড়ে নয়টায় কোনোমতে বসের কাজ শেষ করে, কানাইপুরের বাসে চড়ে যখন আরিফ সাহেব বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন, তখন তার মেজাজ চৈত্র মাসের দুপুরের চেয়েও গরম। বাসস্ট্যান্ডে নামার পর এক রিকশাওয়ালাকে বললেন, মামা, ফুরসা গ্রামে যাবা? ভাড়া কত?

রিকশাওয়ালা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে বলল, আশি টাকা স্যার।

আরিফ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, বল কী মিয়া! প্রতিদিন তো চল্লিশ টাকা দিয়ে যাই। আজকে আশি টাকা কেন?

রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে অবলীলায় বলল, এখন রাত বেশি স্যার, জ্যামও আছে। যাইতে চাইলে ওঠেন, না গেলে নাই। 

কী রাগ করলেন?

আরিফ সাহেব এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন, হ্যাঁ রে ভাই, হ্যাঁ! রাগ করছি! মাথায় একেবারে আগুন ধরে গেছে! 

এখন কী করবা তুমি?

রিকশাওয়ালা একটুও না দমে পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে আরিফ সাহেবের মুখের সামনে ধরে বলল, স্যার, একটু রাগি মুখে পোজ দ্যান তো! একটা রিলস বানামু। ক্যাপশনে লেখমু—যাত্রী ভাইজান আশি টাকা ভাড়া শুনে চিল্লাইতাছে, কী রাগ করলেন! ফেসবুকে ব্যাপক লাইক পামু স্যার!

আরিফ সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফেসবুকে গিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টটাই ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিলেন। রিকশায় চড়ে চোখ বন্ধ করে ভাবলেন, যাক বাঁচা গেল! অন্তত আগামী কয়েক ঘণ্টা এই আপদ শুনতেই হবে না।

রাত এগারোটায় কলিংবেলের শব্দ শুনে রাবেয়া বেগম দরজা খুললেন। আরিফ সাহেবকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে বললেন, ইস! মুখটা একদম শুকায় গেছে। হাত-মুখ ধুয়ে এসো, টেবিলে ভাত দিচ্ছি।

আরিফ সাহেব হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। যাক, অন্তত নিজের ঘরে শান্তি আছে। হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসতেই রাবেয়া বেগম গরম ভাতের সাথে বাটি ভর্তি বিখ্যাত খাসির মাংসের ঝোল নিয়ে এলেন।

আরিফ সাহেব মহা আনন্দে এক লোকমা মুখে দিতেই তার পুরো শরীর রি-রি করে উঠল। মাংস চিবানো যাচ্ছে না, একেবারে কাঁচা ও শক্ত!

তিনি ব্যথিত হৃদয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, রাবেয়া, মাংসটা তো সেদ্ধই হয় নাই! একদম শক্ত কাঁচা রয়ে গেছে!

রাবেয়া বেগম আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মুচকি হেসে বললেন, আসলে হয়েছে কী, ওই ফেসবুকের একটা ভিডিও দেখতে দেখতে মাংসের পাতিল কখন যে চুলা থেকে নামাইছি খেয়ালই নাই। 

কী রাগ করলা?

আরিফ সাহেব আর ভাত গিলতে পারলেন না। ডাইনিং চেয়ার থেকে উঠে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন—না গো প্রেয়সী, আমি একটুও রাগ করিনি। আমি শুধু ভাবছি, কাল সকালে যদি কোনোরকমে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অনন্যা সুপার মার্কেটের দোতলার শাখায় যাই, আর ক্যাশিয়ার যদি টাকা দেওয়ার সময় বলে—আজকে ক্যাশে টাকা কম, কী রাগ করলা?—তবে আমি সোজা সেই কানাইপুরের ২০০ বছরের পুরোনো অচিন গাছে গিয়ে ফাঁসি দেব! আর মরার আগে গাছের ডালে একটা চিরকুট লিখে যাব—আমি সুইসাইড করলাম, কী... রাগ করলা?

বিষয় : ফেসবুক ভাইরাল

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


কী রাগ করলা?

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image

আরিফ সাহেব গত দুই দিন ধরে চরম ডিপ্রেশনে আছেন। ফেসবুক স্ক্রল করলেই তার স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—কী রাগ করলা?। 

কমেন্ট বক্সে কেউ কাউকে পঁচিয়ে দিয়ে নিচে লিখে রাখছে—কী রাগ করলা?। এমনকি তার নিজের স্ত্রী রাবেয়া বেগম আজ সকালে তরকারিতে লবণ কম দিয়ে যখন বললেন, আজকে তরকারিতে নুন একটু কম হইছে, কী রাগ করলা?

—তখন আরিফ সাহেবের মনে হলো, এই ডায়ালগ আবিষ্কারককে সামনে পেলে তিনি জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলতেন!

তবে আরিফ সাহেবের আসল পরীক্ষাটা শুরু হলো আজ অফিসে যাওয়ার পর।

অফিসে ঢুকতেই দেখা গেল পিয়ন মন্টু মিয়া আজ চা দিতে আধা ঘণ্টা দেরি করেছে। আরিফ সাহেব চোখ গরম করে বলতেই মন্টু দাঁত কেলিয়ে বলল, স্যার, চিনি একটু বেশি পইড়া গেছে। কী রাগ করলেন?

আরিফ সাহেব ফাইলটা ছুঁড়ে মারতে গিয়েও নিজেকে সামলালেন। যুগটাই মিমের যুগ, রাগলে নিজেরই লস।

দুপুরে লাঞ্চের পর যখন আরিফ সাহেব একটু ঝিমোচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তার কিউবিকলে এসে হাজির হলেন খিটখিটে স্বভাবের বস মোজাম্মেল সাহেব। হাতে একটা মোটাসোটা ফাইলের স্তূপ।

বস ফাইলটা আরিফ সাহেবের টেবিলের ওপর ধপ করে ফেলে বললেন, আরিফ সাহেব, এই সাতাশটা রিপোর্টের ফরম্যাটিং একদম ঠিকঠাক হয়নি। আজ রাত দশটার মধ্যে পুরোটা রিকারেকশন করে ইমেইল করবেন।

আরিফ সাহেবের মাথায় তখন ৪৪টি ৪G ভোল্টের শক লাগল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, কিন্তু স্যার, আজ তো আমার বিবাহবার্ষিকী! সন্ধ্যায় ফ্যামিলি নিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল—


বস মোজাম্মেল সাহেব নিজের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে, রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বললেন, আজকে যেতে পারবেন না আরিফ সাহেব। কী রাগ করলেন?

আরিফ সাহেবের ইচ্ছে করছিল বসের চকচকে টাকটার ওপর ফাইলের সাতাশটা পৃষ্ঠা একে একে মারতে। কিন্তু চাকরি বাঁচানোর তাগিদে মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললেন, না স্যার, রাগ করব কেন? আমোদিত হলাম!

রাত সাড়ে নয়টায় কোনোমতে বসের কাজ শেষ করে, কানাইপুরের বাসে চড়ে যখন আরিফ সাহেব বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন, তখন তার মেজাজ চৈত্র মাসের দুপুরের চেয়েও গরম। বাসস্ট্যান্ডে নামার পর এক রিকশাওয়ালাকে বললেন, মামা, ফুরসা গ্রামে যাবা? ভাড়া কত?

রিকশাওয়ালা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে বলল, আশি টাকা স্যার।

আরিফ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, বল কী মিয়া! প্রতিদিন তো চল্লিশ টাকা দিয়ে যাই। আজকে আশি টাকা কেন?

রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে অবলীলায় বলল, এখন রাত বেশি স্যার, জ্যামও আছে। যাইতে চাইলে ওঠেন, না গেলে নাই। 

কী রাগ করলেন?

আরিফ সাহেব এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। চিৎকার করে বললেন, হ্যাঁ রে ভাই, হ্যাঁ! রাগ করছি! মাথায় একেবারে আগুন ধরে গেছে! 

এখন কী করবা তুমি?

রিকশাওয়ালা একটুও না দমে পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে আরিফ সাহেবের মুখের সামনে ধরে বলল, স্যার, একটু রাগি মুখে পোজ দ্যান তো! একটা রিলস বানামু। ক্যাপশনে লেখমু—যাত্রী ভাইজান আশি টাকা ভাড়া শুনে চিল্লাইতাছে, কী রাগ করলেন! ফেসবুকে ব্যাপক লাইক পামু স্যার!

আরিফ সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফেসবুকে গিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টটাই ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিলেন। রিকশায় চড়ে চোখ বন্ধ করে ভাবলেন, যাক বাঁচা গেল! অন্তত আগামী কয়েক ঘণ্টা এই আপদ শুনতেই হবে না।

রাত এগারোটায় কলিংবেলের শব্দ শুনে রাবেয়া বেগম দরজা খুললেন। আরিফ সাহেবকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে বললেন, ইস! মুখটা একদম শুকায় গেছে। হাত-মুখ ধুয়ে এসো, টেবিলে ভাত দিচ্ছি।

আরিফ সাহেব হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। যাক, অন্তত নিজের ঘরে শান্তি আছে। হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসতেই রাবেয়া বেগম গরম ভাতের সাথে বাটি ভর্তি বিখ্যাত খাসির মাংসের ঝোল নিয়ে এলেন।

আরিফ সাহেব মহা আনন্দে এক লোকমা মুখে দিতেই তার পুরো শরীর রি-রি করে উঠল। মাংস চিবানো যাচ্ছে না, একেবারে কাঁচা ও শক্ত!

তিনি ব্যথিত হৃদয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, রাবেয়া, মাংসটা তো সেদ্ধই হয় নাই! একদম শক্ত কাঁচা রয়ে গেছে!

রাবেয়া বেগম আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মুচকি হেসে বললেন, আসলে হয়েছে কী, ওই ফেসবুকের একটা ভিডিও দেখতে দেখতে মাংসের পাতিল কখন যে চুলা থেকে নামাইছি খেয়ালই নাই। 

কী রাগ করলা?

আরিফ সাহেব আর ভাত গিলতে পারলেন না। ডাইনিং চেয়ার থেকে উঠে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন—না গো প্রেয়সী, আমি একটুও রাগ করিনি। আমি শুধু ভাবছি, কাল সকালে যদি কোনোরকমে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অনন্যা সুপার মার্কেটের দোতলার শাখায় যাই, আর ক্যাশিয়ার যদি টাকা দেওয়ার সময় বলে—আজকে ক্যাশে টাকা কম, কী রাগ করলা?—তবে আমি সোজা সেই কানাইপুরের ২০০ বছরের পুরোনো অচিন গাছে গিয়ে ফাঁসি দেব! আর মরার আগে গাছের ডালে একটা চিরকুট লিখে যাব—আমি সুইসাইড করলাম, কী... রাগ করলা?


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো