যশোরের গ্রামীণ জনপদে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার বাবলা, আকাশমণি ও শিশুগাছ আজ অস্তিত্ব সংকটে। প্রথাগতভাবে গাছ কাটার পরিবর্তে গ্রহণ করা হয়েছে কৌশলী নিধন পদ্ধতি। গাছের গোড়ার ছাল কেটে শুকিয়ে ফেলে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাবাড় করা হচ্ছে সরকারি এই বনজ সম্পদ। গত এক দশকে সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গাছ হারিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো তদারকি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে চাঁচড়া ইউনিয়নের সাড়াপোল-গাজীরপাড়া-সাড়াঘুটো সড়ক ঘুরে দেখা গেছে গাছ মারার এক অভিনব দৃশ্য। দুর্বৃত্তরা প্রথমে গাছের গোড়ার ছাল চারপাশ দিয়ে কেটে রাখছে। কিছুদিন পর কাটা অংশের নিচে আবার দা দিয়ে কুপিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে গাছের খাদ্য ও পানি চলাচল বন্ধ হয়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। গাছটি পুরোপুরি মরে গেলে তখন সেটিকে মৃত দেখিয়ে সুবিধামতো কেটে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, আমি ওই এলাকা ঘুরে দেখেছি। গাছ মারার এই কৌশলটি অত্যন্ত জঘন্য। এতে শুধু সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে না, বরং যশোরের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের পাশের জমির মালিকদের কেউ কেউ নিজেদের সুবিধার জন্য এই নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছেন। সাড়াপোল গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জীব মণ্ডলের জমির সামনের একটি গাছও অবশিষ্ট নেই। স্থানীয়দের দাবি, তিনি কৌশলে সব গাছ মেরে ফেলেছেন। তবে সঞ্জীব মণ্ডল এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গাছগুলো এমনিতেই মরে গেছে, এতে আমার কিছু করার নেই।
সামাজিক বনায়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ওই এলাকার ১১ কিলোমিটার সড়কে প্রায় ১১ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র আড়াই হাজারের মতো গাছ টিকে আছে। সামাজিক বনায়ন বিভাগ নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, কয়েকটি গাছের গোড়ার ছাল কেটে রাখার চিত্র তাঁরাও দেখেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
যশোরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল জানান, কিছু গাছ উদ্ধার করে উপকারভোগীদের বাড়িতে রাখা হয়েছে যা পরে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। কেউ অবৈধভাবে গাছ কাটলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বন কর্মকর্তারা জানান, বনায়ন সমিতির সদস্যদের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তিতে এই গাছগুলো লাগানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী ১০ বছর পর গাছ কাটার টাকা সমিতির সদস্যরা পেয়ে থাকেন। কিন্তু চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই এভাবে গাছ নিধন হওয়ায় একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত এই নীরব বৃক্ষনিধন বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
যশোরের গ্রামীণ জনপদে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার বাবলা, আকাশমণি ও শিশুগাছ আজ অস্তিত্ব সংকটে। প্রথাগতভাবে গাছ কাটার পরিবর্তে গ্রহণ করা হয়েছে কৌশলী নিধন পদ্ধতি। গাছের গোড়ার ছাল কেটে শুকিয়ে ফেলে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাবাড় করা হচ্ছে সরকারি এই বনজ সম্পদ। গত এক দশকে সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গাছ হারিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো তদারকি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে চাঁচড়া ইউনিয়নের সাড়াপোল-গাজীরপাড়া-সাড়াঘুটো সড়ক ঘুরে দেখা গেছে গাছ মারার এক অভিনব দৃশ্য। দুর্বৃত্তরা প্রথমে গাছের গোড়ার ছাল চারপাশ দিয়ে কেটে রাখছে। কিছুদিন পর কাটা অংশের নিচে আবার দা দিয়ে কুপিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে গাছের খাদ্য ও পানি চলাচল বন্ধ হয়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। গাছটি পুরোপুরি মরে গেলে তখন সেটিকে মৃত দেখিয়ে সুবিধামতো কেটে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, আমি ওই এলাকা ঘুরে দেখেছি। গাছ মারার এই কৌশলটি অত্যন্ত জঘন্য। এতে শুধু সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে না, বরং যশোরের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের পাশের জমির মালিকদের কেউ কেউ নিজেদের সুবিধার জন্য এই নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছেন। সাড়াপোল গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জীব মণ্ডলের জমির সামনের একটি গাছও অবশিষ্ট নেই। স্থানীয়দের দাবি, তিনি কৌশলে সব গাছ মেরে ফেলেছেন। তবে সঞ্জীব মণ্ডল এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গাছগুলো এমনিতেই মরে গেছে, এতে আমার কিছু করার নেই।
সামাজিক বনায়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ওই এলাকার ১১ কিলোমিটার সড়কে প্রায় ১১ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র আড়াই হাজারের মতো গাছ টিকে আছে। সামাজিক বনায়ন বিভাগ নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, কয়েকটি গাছের গোড়ার ছাল কেটে রাখার চিত্র তাঁরাও দেখেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
যশোরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল জানান, কিছু গাছ উদ্ধার করে উপকারভোগীদের বাড়িতে রাখা হয়েছে যা পরে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। কেউ অবৈধভাবে গাছ কাটলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বন কর্মকর্তারা জানান, বনায়ন সমিতির সদস্যদের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তিতে এই গাছগুলো লাগানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী ১০ বছর পর গাছ কাটার টাকা সমিতির সদস্যরা পেয়ে থাকেন। কিন্তু চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই এভাবে গাছ নিধন হওয়ায় একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত এই নীরব বৃক্ষনিধন বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন