মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

নির্বিচারে গাছ কাটা ও পরিবেশ ধ্বংসের মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই সবুজ পরিকল্পনা।

তীব্র গরমে জনজীবনে নাভিশ্বাস : কেবল প্রকৃতি নয়, দায়ী কি আমাদের উদাসীনতাও?

তীব্র গরমে জনজীবনে নাভিশ্বাস : কেবল প্রকৃতি নয়, দায়ী কি আমাদের উদাসীনতাও?
ছবি : সংগৃহীত

চৈত্রের বিদায় আর বৈশাখের আগমনে বাংলার প্রকৃতিতে এখন কালবৈশাখীর স্নিগ্ধতা থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা আজ তার উল্টো। খাঁ খাঁ রোদ, তপ্ত লু-হাওয়া আর অসহ্য গরমে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। দেশের ওপর দিয়ে বয়ে চলা এই তীব্র ও অতি তীব্র দাবদাহ কেবল একটি ঋতুগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের প্রকৃতির এক ভয়াবহ প্রতিশোধের সংকেত। 

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস বলছে, এই তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির জন্য দায় কি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের? নাকি আমাদের দীর্ঘদিনের বৃক্ষনিধন আর পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডও এর পেছনে সমানভাবে দায়ী?

তীব্র এই গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। রিকশাচালক, দিনমজুর এবং নির্মাণশ্রমিকদের জীবিকা এখন সংকটের মুখে। রোদের তাপে বেশিক্ষণ বাইরে থাকা জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে বাড়ছে ডায়েরিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। এর ওপর লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল শারীরিক কষ্টই দিচ্ছে না, বরং উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বন উজাড়ের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের শহরগুলো আজ একেকটি হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। আমরা নগরায়নের নামে পুকুর-খাল ভরাট করেছি, নির্বিচারে গাছ কেটে বড় বড় দালান তুলেছি। ফলে কংক্রিটের শহর দিনের বেলা তাপ শুষে নিচ্ছে এবং রাতে তা বিকিরণ করে পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। গত কয়েক দশকে আমাদের বনভূমির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যার সরাসরি ফল হলো এই অসহ্য দাবদাহ।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কোনো একক পক্ষকে দায়ী করলে চলবে না। সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরগুলোতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা। জলাধার রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অভিযোজন প্রক্রিয়া বাড়াতে হবে।

একই সাথে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। অকারণে গাছ কাটা বন্ধ করা, ছাদে বা বারান্দায় বাগান করা এবং পানির অপচয় কমানোর মাধ্যমে আমরা ক্ষুদ্র অবদান রাখতে পারি। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রচুর পানি পান করা, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং ছাতা ব্যবহার করার মতো সাধারণ সতর্কতাগুলোও আমাদের জীবন বাঁচাতে পারে।

প্রকৃতি আমাদের সব দেয়, কিন্তু যখন আমরা তাকে ধ্বংস করি, তখন সে নিঃশব্দে প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। আজকের এই তীব্র দাবদাহ আমাদের জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে আগামী দিনগুলোতে এই উত্তাপ আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ—সবাই এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসবেন। মনে রাখতে হবে, একটি সবুজ ও শীতল পৃথিবী গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার জন্য এক অপরিহার্য সংগ্রাম।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


তীব্র গরমে জনজীবনে নাভিশ্বাস : কেবল প্রকৃতি নয়, দায়ী কি আমাদের উদাসীনতাও?

প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

চৈত্রের বিদায় আর বৈশাখের আগমনে বাংলার প্রকৃতিতে এখন কালবৈশাখীর স্নিগ্ধতা থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা আজ তার উল্টো। খাঁ খাঁ রোদ, তপ্ত লু-হাওয়া আর অসহ্য গরমে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। দেশের ওপর দিয়ে বয়ে চলা এই তীব্র ও অতি তীব্র দাবদাহ কেবল একটি ঋতুগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি আমাদের প্রকৃতির এক ভয়াবহ প্রতিশোধের সংকেত। 

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস বলছে, এই তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির জন্য দায় কি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের? নাকি আমাদের দীর্ঘদিনের বৃক্ষনিধন আর পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডও এর পেছনে সমানভাবে দায়ী?

তীব্র এই গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। রিকশাচালক, দিনমজুর এবং নির্মাণশ্রমিকদের জীবিকা এখন সংকটের মুখে। রোদের তাপে বেশিক্ষণ বাইরে থাকা জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে বাড়ছে ডায়েরিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। এর ওপর লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল শারীরিক কষ্টই দিচ্ছে না, বরং উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বন উজাড়ের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের শহরগুলো আজ একেকটি হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। আমরা নগরায়নের নামে পুকুর-খাল ভরাট করেছি, নির্বিচারে গাছ কেটে বড় বড় দালান তুলেছি। ফলে কংক্রিটের শহর দিনের বেলা তাপ শুষে নিচ্ছে এবং রাতে তা বিকিরণ করে পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। গত কয়েক দশকে আমাদের বনভূমির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যার সরাসরি ফল হলো এই অসহ্য দাবদাহ।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কোনো একক পক্ষকে দায়ী করলে চলবে না। সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরগুলোতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা। জলাধার রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অভিযোজন প্রক্রিয়া বাড়াতে হবে।

একই সাথে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। অকারণে গাছ কাটা বন্ধ করা, ছাদে বা বারান্দায় বাগান করা এবং পানির অপচয় কমানোর মাধ্যমে আমরা ক্ষুদ্র অবদান রাখতে পারি। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রচুর পানি পান করা, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং ছাতা ব্যবহার করার মতো সাধারণ সতর্কতাগুলোও আমাদের জীবন বাঁচাতে পারে।

প্রকৃতি আমাদের সব দেয়, কিন্তু যখন আমরা তাকে ধ্বংস করি, তখন সে নিঃশব্দে প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। আজকের এই তীব্র দাবদাহ আমাদের জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে আগামী দিনগুলোতে এই উত্তাপ আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ—সবাই এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসবেন। মনে রাখতে হবে, একটি সবুজ ও শীতল পৃথিবী গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার জন্য এক অপরিহার্য সংগ্রাম।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো