মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সম্পাদকীয়

মা দিবস: ক্যালেন্ডারের এক দিন বনাম অন্তহীন ঋণ ও ভালোবাসার দায়

মা দিবস: ক্যালেন্ডারের এক দিন বনাম অন্তহীন ঋণ ও ভালোবাসার দায়
ছবি: সংগৃহীত

প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার এলে চারপাশটা কেমন যেন এক অলিখিত আবেগ আর উদযাপনে মুখর হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিড থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিপণিবিতান—সবখানেই চোখে পড়ে মা দিবসের রঙিন সব বার্তা ও উপহারের পসরা।

এই আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে অবশ্য আমাদের সমাজে বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া দ্বিমুখী। একদলের মতে, যে মানুষটির ঋণ মেটানোর সাধ্য আমাদের নেই, তাঁকে বছরের মাত্র একটি দিনের ফ্রেমে বন্দি করা এক ধরনের কৃত্রিমতা। অন্যদলের যুক্তি, প্রাত্যহিক জীবনের তীব্র ব্যস্ততায় আমরা যখন সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশের সুযোগ হারিয়ে ফেলি, তখন এই একটি দিন অন্তত ভালোবাসার নদীটির সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে শপথ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

তবে এই তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যদি একটু নিবিড়ভাবে ভাবা যায়, তবে প্রশ্ন জাগে—মাকে নিয়ে বিশেষ একটি দিন নির্দিষ্ট করার পেছনে কি কেবলই জীববিদ্যা বা রক্তের সম্পর্কের মায়ের কথাই ভাবা হয়েছিল? নাকি এই আদিম ও চিরন্তন মা ধ্বনিটির পেছনে লুকিয়ে থাকা এক মহাজাগতিক আশ্রয়ের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল?

প্রকৃতপক্ষে, মা কোনো নিছক জৈবিক সংজ্ঞা নয়। মা হলো একটি ধারণ ক্ষমতা, পরম স্নেহে বুক দিয়ে আগলে রাখার এক অবিকল্প শক্তির নাম। মাতৃস্নেহের এই চিরন্তন প্রবাহে কোনো যতিচিহ্ন বা দাঁড়ি-কমা থাকে না। এটি প্রকৃতির সেই শাশ্বত নিয়মের মতোই সত্য, যা মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সম্ভবত এ কারণেই মাদার-আর্থ বা ধরিত্রী মাতা শব্দবন্ধটি সভ্যতার আদিকাল থেকে মানবমননে গেঁথে আছে। মা দিবস তাই শুধু জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি ভালোবাসার দিন নয়, বরং যে প্রকৃতি আমাদের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, তার প্রতি মানুষের গভীর দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেওয়ারও এক অমল ইশারা।


আমাদের জীবনে মায়েরা পরম আশ্রয় হয়ে থাকেন বটেই, তবে জীবনের পথে চলতে চলতে কখনো কখনো রক্তের সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়েও আমরা মাতৃস্নেহের সমান্তরাল ছায়ার দেখা পাই। তীব্র রোদে হঠাৎ পাওয়া এক সুশীতল গাছের ছায়া, চরম সংকটে অবলীলায় বাড়িয়ে দেওয়া কোনো এক মানবিক হাত, কিংবা জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষুধায় যে প্রাজ্ঞজন আমাদের পরম মমতায় প্রজ্ঞার আলোয় দীক্ষিত করেন—তাঁরাও আমাদের জন্য একেকজন নন-বায়োলজিক্যাল বা আত্মিক মা। মা দিবস হলো সৃষ্টির সেই নিঃশর্ত ভালোবাসার অকৃত্রিম রূপকে শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

বর্তমানে আমাদের চারপাশের যান্ত্রিকতা ও ব্যস্ততা যখন মানবিক সম্পর্কগুলোকে হালকা করে তুলছে, তখন মা দিবসের মতো আয়োজনগুলো আমাদের আত্মানুসন্ধানের তাগিদ দেয়। বৃদ্ধাশ্রমে কাটানো অসহায় মায়েদের দীর্ঘশ্বাস কিংবা একাকী মায়েরা যখন তীব্র নিঃসঙ্গতায় ভোগেন, তখন শুধু বছরে একদিন ফুল কিংবা কেক কেটে এই দিনটিকে স্বার্থক করা যায় না। মার প্রতি ভালোবাসা যেমন প্রতিদিনের, তেমনি তাঁর অধিকার রক্ষা ও মর্যাদার লড়াইটাও প্রাত্যহিক।

মায়ের চোখ দিয়েই আসলে আমরা আমাদের জীবনের এবং এই সুন্দর পৃথিবীর গভীরতম রূপটা অনুভব করতে শিখি। তাই এই দিনটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, মায়ের আজীবন ত্যাগকে মূল্যায়ন করা এবং পাশাপাশি আমাদের পরম আশ্রয় এই প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধ হওয়াটাই হোক এবারের মা দিবসের মূল অঙ্গীকার। তবেই কেবল ক্যালেন্ডারের এই বিশেষ দিনটি প্রকৃত অর্থে মহিমান্বিত ও অর্থবহ হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


মা দিবস: ক্যালেন্ডারের এক দিন বনাম অন্তহীন ঋণ ও ভালোবাসার দায়

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার এলে চারপাশটা কেমন যেন এক অলিখিত আবেগ আর উদযাপনে মুখর হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিড থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিপণিবিতান—সবখানেই চোখে পড়ে মা দিবসের রঙিন সব বার্তা ও উপহারের পসরা।

এই আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে অবশ্য আমাদের সমাজে বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া দ্বিমুখী। একদলের মতে, যে মানুষটির ঋণ মেটানোর সাধ্য আমাদের নেই, তাঁকে বছরের মাত্র একটি দিনের ফ্রেমে বন্দি করা এক ধরনের কৃত্রিমতা। অন্যদলের যুক্তি, প্রাত্যহিক জীবনের তীব্র ব্যস্ততায় আমরা যখন সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশের সুযোগ হারিয়ে ফেলি, তখন এই একটি দিন অন্তত ভালোবাসার নদীটির সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে শপথ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

তবে এই তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যদি একটু নিবিড়ভাবে ভাবা যায়, তবে প্রশ্ন জাগে—মাকে নিয়ে বিশেষ একটি দিন নির্দিষ্ট করার পেছনে কি কেবলই জীববিদ্যা বা রক্তের সম্পর্কের মায়ের কথাই ভাবা হয়েছিল? নাকি এই আদিম ও চিরন্তন মা ধ্বনিটির পেছনে লুকিয়ে থাকা এক মহাজাগতিক আশ্রয়ের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল?

প্রকৃতপক্ষে, মা কোনো নিছক জৈবিক সংজ্ঞা নয়। মা হলো একটি ধারণ ক্ষমতা, পরম স্নেহে বুক দিয়ে আগলে রাখার এক অবিকল্প শক্তির নাম। মাতৃস্নেহের এই চিরন্তন প্রবাহে কোনো যতিচিহ্ন বা দাঁড়ি-কমা থাকে না। এটি প্রকৃতির সেই শাশ্বত নিয়মের মতোই সত্য, যা মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সম্ভবত এ কারণেই মাদার-আর্থ বা ধরিত্রী মাতা শব্দবন্ধটি সভ্যতার আদিকাল থেকে মানবমননে গেঁথে আছে। মা দিবস তাই শুধু জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি ভালোবাসার দিন নয়, বরং যে প্রকৃতি আমাদের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, তার প্রতি মানুষের গভীর দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেওয়ারও এক অমল ইশারা।


আমাদের জীবনে মায়েরা পরম আশ্রয় হয়ে থাকেন বটেই, তবে জীবনের পথে চলতে চলতে কখনো কখনো রক্তের সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়েও আমরা মাতৃস্নেহের সমান্তরাল ছায়ার দেখা পাই। তীব্র রোদে হঠাৎ পাওয়া এক সুশীতল গাছের ছায়া, চরম সংকটে অবলীলায় বাড়িয়ে দেওয়া কোনো এক মানবিক হাত, কিংবা জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষুধায় যে প্রাজ্ঞজন আমাদের পরম মমতায় প্রজ্ঞার আলোয় দীক্ষিত করেন—তাঁরাও আমাদের জন্য একেকজন নন-বায়োলজিক্যাল বা আত্মিক মা। মা দিবস হলো সৃষ্টির সেই নিঃশর্ত ভালোবাসার অকৃত্রিম রূপকে শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

বর্তমানে আমাদের চারপাশের যান্ত্রিকতা ও ব্যস্ততা যখন মানবিক সম্পর্কগুলোকে হালকা করে তুলছে, তখন মা দিবসের মতো আয়োজনগুলো আমাদের আত্মানুসন্ধানের তাগিদ দেয়। বৃদ্ধাশ্রমে কাটানো অসহায় মায়েদের দীর্ঘশ্বাস কিংবা একাকী মায়েরা যখন তীব্র নিঃসঙ্গতায় ভোগেন, তখন শুধু বছরে একদিন ফুল কিংবা কেক কেটে এই দিনটিকে স্বার্থক করা যায় না। মার প্রতি ভালোবাসা যেমন প্রতিদিনের, তেমনি তাঁর অধিকার রক্ষা ও মর্যাদার লড়াইটাও প্রাত্যহিক।

মায়ের চোখ দিয়েই আসলে আমরা আমাদের জীবনের এবং এই সুন্দর পৃথিবীর গভীরতম রূপটা অনুভব করতে শিখি। তাই এই দিনটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, মায়ের আজীবন ত্যাগকে মূল্যায়ন করা এবং পাশাপাশি আমাদের পরম আশ্রয় এই প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধ হওয়াটাই হোক এবারের মা দিবসের মূল অঙ্গীকার। তবেই কেবল ক্যালেন্ডারের এই বিশেষ দিনটি প্রকৃত অর্থে মহিমান্বিত ও অর্থবহ হয়ে উঠবে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো