রোদ-বৃষ্টি কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা—যেকোনো সংকটে একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য ও মানবিক, তা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকটির পাশে কতটুকু দৃঢ়তার সাথে এসে দাঁড়াচ্ছে। যে মানুষটি আকস্মিক কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন, যে প্রবীণ কর্মজীবন শেষে আয়ের পথ হারিয়েছেন, কিংবা যে মা তাঁর সন্তান নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাঁদের সুরক্ষার কোনো জাল দিতে পারছে কি না—সেটাই একটি দেশের প্রকৃত পরিচয়।
আর এই মানবিক দায়বদ্ধতাকে কাঠামোগত রূপ দেওয়ার বৈশ্বিক নামই হলো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (Social Security System)। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা হলো প্রতিটি মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় করুণা, দান বা দয়া নয়, বরং নাগরিকের ন্যায্য রাষ্ট্রীয় পাওনা।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, বিশেষ করে ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে কল্যাণ রাষ্ট্র বা Welfare State-এর যে টেকসই মডেল গড়ে উঠেছে, তার মূলে রয়েছে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা। ধনীদের ওপর উচ্চ হারে কর বসিয়ে সেই অর্থ দিয়ে দুর্বলদের জন্য বেকার ভাতা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং পেনশন নিশ্চিত করা হয়। ফ্রান্সের মতো রাষ্ট্রগুলোতে সিএএফ (CAF) কিংবা আরএসএ (RSA)-র মতো কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবার ও আবাসন ভাতা সরাসরি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। যদিও সেসব দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও করের ভিত্তি আমাদের চেয়ে ভিন্ন, তবুও বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ বিনির্মাণে তাদের এই দর্শন আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নিরেট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রয়োজনীয়তা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তীব্র। দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রতিদিন নানা ধরনের কাঠামোগত ও প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে জীবনসংগ্রাম করছেন :
এই রূঢ় বাস্তবতার মাঝে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বিস্তৃত করতে বর্তমান সরকারের আগ্রহ ও সতর্ক পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের চালু করা ফ্যামিলি কার্ড—যার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছে, তা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি সরাসরি ও বাস্তবমুখী সময়োচিত উদ্যোগ। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতি প্রণয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন, তা একটি কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।
তবে সম্পাদকীয় নীতি থেকে আমাদের স্পষ্ট করে বলতে চাই—মহৎ প্রতিশ্রুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে আমাদের দেশে অতীতে সবসময়ই এক দুস্তর ব্যবধান ছিল। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো সফল না হওয়ার নেপথ্যে প্রধান অন্তরায় হলো সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দলীয় স্বজনপ্রীতি ও স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতি। সঠিক ও জেনুইন মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর বদলে প্রায়শই দেখা যায় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ বা সুবিধা বণ্টন হচ্ছে, যা এই ব্যবস্থার মূল নীতিকেই কলঙ্কিত করে।
সামাজিক সুরক্ষার এই সম্প্রসারণের উদ্যোগকে যদি কেবল একটি প্রতীকী প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না রেখে টেকসই করতে হয়, তবে সরকারকে অবিলম্বে ৩টি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে :
আমরা মনে করি, সামাজিক সুরক্ষা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দলীয় ইশতেহারের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের অংশ। প্রতিটি সুবিধাভোগী মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবার আগে একজন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। সরকার এই ধ্রুব সত্যটি যত দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে পারবে, ততই বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন সফল হবে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
রোদ-বৃষ্টি কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা—যেকোনো সংকটে একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য ও মানবিক, তা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকটির পাশে কতটুকু দৃঢ়তার সাথে এসে দাঁড়াচ্ছে। যে মানুষটি আকস্মিক কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন, যে প্রবীণ কর্মজীবন শেষে আয়ের পথ হারিয়েছেন, কিংবা যে মা তাঁর সন্তান নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাঁদের সুরক্ষার কোনো জাল দিতে পারছে কি না—সেটাই একটি দেশের প্রকৃত পরিচয়।
আর এই মানবিক দায়বদ্ধতাকে কাঠামোগত রূপ দেওয়ার বৈশ্বিক নামই হলো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (Social Security System)। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা হলো প্রতিটি মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় করুণা, দান বা দয়া নয়, বরং নাগরিকের ন্যায্য রাষ্ট্রীয় পাওনা।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, বিশেষ করে ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে কল্যাণ রাষ্ট্র বা Welfare State-এর যে টেকসই মডেল গড়ে উঠেছে, তার মূলে রয়েছে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা। ধনীদের ওপর উচ্চ হারে কর বসিয়ে সেই অর্থ দিয়ে দুর্বলদের জন্য বেকার ভাতা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং পেনশন নিশ্চিত করা হয়। ফ্রান্সের মতো রাষ্ট্রগুলোতে সিএএফ (CAF) কিংবা আরএসএ (RSA)-র মতো কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবার ও আবাসন ভাতা সরাসরি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। যদিও সেসব দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও করের ভিত্তি আমাদের চেয়ে ভিন্ন, তবুও বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ বিনির্মাণে তাদের এই দর্শন আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নিরেট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রয়োজনীয়তা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তীব্র। দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রতিদিন নানা ধরনের কাঠামোগত ও প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে জীবনসংগ্রাম করছেন :
এই রূঢ় বাস্তবতার মাঝে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বিস্তৃত করতে বর্তমান সরকারের আগ্রহ ও সতর্ক পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের চালু করা ফ্যামিলি কার্ড—যার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছে, তা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি সরাসরি ও বাস্তবমুখী সময়োচিত উদ্যোগ। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতি প্রণয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন, তা একটি কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।
তবে সম্পাদকীয় নীতি থেকে আমাদের স্পষ্ট করে বলতে চাই—মহৎ প্রতিশ্রুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে আমাদের দেশে অতীতে সবসময়ই এক দুস্তর ব্যবধান ছিল। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো সফল না হওয়ার নেপথ্যে প্রধান অন্তরায় হলো সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দলীয় স্বজনপ্রীতি ও স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতি। সঠিক ও জেনুইন মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর বদলে প্রায়শই দেখা যায় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ বা সুবিধা বণ্টন হচ্ছে, যা এই ব্যবস্থার মূল নীতিকেই কলঙ্কিত করে।
সামাজিক সুরক্ষার এই সম্প্রসারণের উদ্যোগকে যদি কেবল একটি প্রতীকী প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না রেখে টেকসই করতে হয়, তবে সরকারকে অবিলম্বে ৩টি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে :
আমরা মনে করি, সামাজিক সুরক্ষা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দলীয় ইশতেহারের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের অংশ। প্রতিটি সুবিধাভোগী মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবার আগে একজন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। সরকার এই ধ্রুব সত্যটি যত দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে পারবে, ততই বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন সফল হবে।

আপনার মতামত লিখুন