দেশের সাধারণ মানুষ যখন লাগামহীন মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এক লাফে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির যে প্রস্তাব এনেছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা যায় না। বর্তমান বাজারে যেখানে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আমজনতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে, সেখানে বিদ্যুতের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দেবে।
বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে—এই রূঢ় সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বর্তমান পাইকারি দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা হলেও এর উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। এর ফলে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৬৩ হাজার কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ৬৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। পিডিবির দাবি, দাম না বাড়ালে পুরো বিদ্যুৎ খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল লোকসান ও কাঠামোগত সংকটের দায় আসলে কার? বিদ্যুৎ খাতের এই রুগ্ন দশার মূলে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা চরম অব্যবস্থাপনা, অপচয়, দুর্নীতি এবং বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা। বিদ্যুৎ খাতের ভেতরের এই কাঠামোগত রোগ নিরাময় না করে, কেবল সস্তা সমাধান হিসেবে বারবার দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর বোঝা চাপানোর এই নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণশুনানিতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব-সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা যে তীব্র বিরোধিতা করেছেন, তা অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সেচ পাম্পের খরচ বাড়লে কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে, কলকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়লে দেশীয় পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হবে এবং আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। ফলে পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি আরও এক ধাপ উসকে উঠবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে।
আমরা নীতিগতভাবে সরকারের ঢালাও ভর্তুকি সংস্কৃতির পক্ষে নই, কারণ ভর্তুকির টাকার জোগানও শেষ পর্যন্ত জনগণের ট্যাক্সের পয়সা থেকেই আসে। তবে মূল্যবৃদ্ধির এই শর্টকাট পথে হাঁটার আগে সরকারের উচিত ছিল বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লস, ওভার-ইনভয়েসিং ও অপশাসন শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। অনিয়ম বন্ধ করা গেলে ভর্তুকির চাপ এমনিতেই অর্ধেক কমে আসত। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারে সরকার কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
বিষয় : বিদ্যুত মূল্যবৃদ্ধি দেশের মানুষ

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
দেশের সাধারণ মানুষ যখন লাগামহীন মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এক লাফে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির যে প্রস্তাব এনেছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা যায় না। বর্তমান বাজারে যেখানে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আমজনতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে, সেখানে বিদ্যুতের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দেবে।
বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে—এই রূঢ় সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বর্তমান পাইকারি দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা হলেও এর উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। এর ফলে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৬৩ হাজার কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ৬৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। পিডিবির দাবি, দাম না বাড়ালে পুরো বিদ্যুৎ খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল লোকসান ও কাঠামোগত সংকটের দায় আসলে কার? বিদ্যুৎ খাতের এই রুগ্ন দশার মূলে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা চরম অব্যবস্থাপনা, অপচয়, দুর্নীতি এবং বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা। বিদ্যুৎ খাতের ভেতরের এই কাঠামোগত রোগ নিরাময় না করে, কেবল সস্তা সমাধান হিসেবে বারবার দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর বোঝা চাপানোর এই নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণশুনানিতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব-সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা যে তীব্র বিরোধিতা করেছেন, তা অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সেচ পাম্পের খরচ বাড়লে কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে, কলকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়লে দেশীয় পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হবে এবং আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। ফলে পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি আরও এক ধাপ উসকে উঠবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে।
আমরা নীতিগতভাবে সরকারের ঢালাও ভর্তুকি সংস্কৃতির পক্ষে নই, কারণ ভর্তুকির টাকার জোগানও শেষ পর্যন্ত জনগণের ট্যাক্সের পয়সা থেকেই আসে। তবে মূল্যবৃদ্ধির এই শর্টকাট পথে হাঁটার আগে সরকারের উচিত ছিল বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লস, ওভার-ইনভয়েসিং ও অপশাসন শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। অনিয়ম বন্ধ করা গেলে ভর্তুকির চাপ এমনিতেই অর্ধেক কমে আসত। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারে সরকার কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন