বোরো ধানের ভরা মৌসুমে তপ্ত রোদে যখন মাঠ ফেটে চৌচির, তখন এক ফোঁটা জলের জন্য পাম্পে পাম্পে হাহাকার করছেন দেশের কৃষক। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতার প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট, যার সরাসরি আঘাত পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষি খাতে। রংপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর ও রাজশাহীসহ দেশের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে সেচ কাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
রংপুর বিভাগে অতিরিক্ত খরচের বোঝা
রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় এবার ৫ লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। ৯৬ হাজারের বেশি ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপের জন্য প্রয়োজনীয় তেল না মেলায় বিপাকে পড়েছেন ইদ্রিস আলীর মতো হাজারো কৃষক। হাড়িয়ারকুঠির এই কৃষক জানান, ২০০ টাকার ডিজেল সংগ্রহ করতে তাঁর যাতায়াত খরচই হচ্ছে ১২০ টাকা। কৃষি বিভাগের মতে, এই সংকটে সেচ বাবদ কৃষকের অতিরিক্ত খরচ হতে পারে প্রায় ২৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
পাম্পে দীর্ঘ সারি, মিলছে না চাহিদামতো তেল
গঙ্গাচড়ার শিহাব ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে অমানবিক চিত্র। জেনুইন কৃষক নিশ্চিত করতে পাম্প কর্তৃপক্ষ ক্যানে তেল দেওয়া বন্ধ রেখেছে। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বাইসাইকেলের পেছনে ভারী সেচপাম্প বেঁধে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পাম্পে আসছেন। কোলকোন্দ ইউনিয়নের কৃষক শাহিন আক্ষেপ করে বলেন, ৬ একর ভুট্টার জন্য সপ্তাহে ৭ লিটার তেল লাগে, অথচ ৪ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পাম্প নিয়ে আসার পর দিচ্ছে মাত্র ৩ লিটার।
কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে পাটের আবাদও হুমকিতে
কুষ্টিয়ার কৃষক আশরাফুল আলমের ১৩ বিঘা জমির মধ্যে ৮ বিঘায় ধান। প্রতিদিন ১৯ লিটার তেলের বিপরীতে তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৬ লিটার। অন্যদিকে ফরিদপুরের নগরকান্দার আমিরুল মোল্যা জানান, পাম্পে তেল না পেয়ে খোলা বাজার থেকে ১৫০ টাকা লিটার দরে তেল কিনতে হচ্ছে, যা সাধারণ কৃষকের সাধ্যের বাইরে। সময়মতো পানি দিতে না পারলে পাটগাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বিপাকে রাজশাহী ও গোপালগঞ্জের চরাঞ্চল
রাজশাহীর পুঠিয়ায় ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল। গোপালগঞ্জের কৃষক রহমত মিয়া বলেন, এখন ধানে থোড় আসার সময়। এই সময় সেচ দিতে না পারলে ধান পুষ্ট হবে না, সব চিটা হয়ে যাবে।
সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন জেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকৃত কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে স্লিপ প্রথা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কৃষকদের দাবি—আশ্বাস নয়, মাঠ বাঁচাতে দ্রুত পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় ভরা মৌসুমে ফসল হারিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে দেশ।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুর, পাবনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জের নিজস্ব প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
বোরো ধানের ভরা মৌসুমে তপ্ত রোদে যখন মাঠ ফেটে চৌচির, তখন এক ফোঁটা জলের জন্য পাম্পে পাম্পে হাহাকার করছেন দেশের কৃষক। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতার প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট, যার সরাসরি আঘাত পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষি খাতে। রংপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর ও রাজশাহীসহ দেশের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে সেচ কাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
রংপুর বিভাগে অতিরিক্ত খরচের বোঝা
রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় এবার ৫ লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। ৯৬ হাজারের বেশি ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপের জন্য প্রয়োজনীয় তেল না মেলায় বিপাকে পড়েছেন ইদ্রিস আলীর মতো হাজারো কৃষক। হাড়িয়ারকুঠির এই কৃষক জানান, ২০০ টাকার ডিজেল সংগ্রহ করতে তাঁর যাতায়াত খরচই হচ্ছে ১২০ টাকা। কৃষি বিভাগের মতে, এই সংকটে সেচ বাবদ কৃষকের অতিরিক্ত খরচ হতে পারে প্রায় ২৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
পাম্পে দীর্ঘ সারি, মিলছে না চাহিদামতো তেল
গঙ্গাচড়ার শিহাব ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে অমানবিক চিত্র। জেনুইন কৃষক নিশ্চিত করতে পাম্প কর্তৃপক্ষ ক্যানে তেল দেওয়া বন্ধ রেখেছে। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বাইসাইকেলের পেছনে ভারী সেচপাম্প বেঁধে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পাম্পে আসছেন। কোলকোন্দ ইউনিয়নের কৃষক শাহিন আক্ষেপ করে বলেন, ৬ একর ভুট্টার জন্য সপ্তাহে ৭ লিটার তেল লাগে, অথচ ৪ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পাম্প নিয়ে আসার পর দিচ্ছে মাত্র ৩ লিটার।
কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে পাটের আবাদও হুমকিতে
কুষ্টিয়ার কৃষক আশরাফুল আলমের ১৩ বিঘা জমির মধ্যে ৮ বিঘায় ধান। প্রতিদিন ১৯ লিটার তেলের বিপরীতে তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৬ লিটার। অন্যদিকে ফরিদপুরের নগরকান্দার আমিরুল মোল্যা জানান, পাম্পে তেল না পেয়ে খোলা বাজার থেকে ১৫০ টাকা লিটার দরে তেল কিনতে হচ্ছে, যা সাধারণ কৃষকের সাধ্যের বাইরে। সময়মতো পানি দিতে না পারলে পাটগাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বিপাকে রাজশাহী ও গোপালগঞ্জের চরাঞ্চল
রাজশাহীর পুঠিয়ায় ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল। গোপালগঞ্জের কৃষক রহমত মিয়া বলেন, এখন ধানে থোড় আসার সময়। এই সময় সেচ দিতে না পারলে ধান পুষ্ট হবে না, সব চিটা হয়ে যাবে।
সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন জেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকৃত কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে স্লিপ প্রথা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কৃষকদের দাবি—আশ্বাস নয়, মাঠ বাঁচাতে দ্রুত পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় ভরা মৌসুমে ফসল হারিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে দেশ।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুর, পাবনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জের নিজস্ব প্রতিনিধিরা।

আপনার মতামত লিখুন